মুহম্মদ আলতাফ হোসেন
রাষ্ট্রপতি আগামী ২৭ মে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন আহ্বান করেছেন। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৭ জুন ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে। বাজেট সামনে
রেখে দুই দলেরই বেশিসংখ্যক সদস্য আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন, যা অন্য অধিবেশনে সম্ভব নয়। সংসদ সদস্য হিসেবে এটি তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বিরোধী দলের সদস্যরা সেই সুযোগ কেন হাতছাড়া করবেন?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা না-থাকা নিয়ে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকারি দলের ভাষ্য হচ্ছে, সংসদের বাইরে আলোচনা করা যাবে না। আর বিরোধী দল বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানলেই সরকারের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। দুই পক্ষকেই এই অনড় অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। বিরোধী দলের কথা অনুযায়ী সরকার যদি তত্ত্বাবধায়কের দাবি মেনেই নেয়, তাহলে আলোচনার কী প্রয়োজন?
আবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদের বাইরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো আলোচনা হতে পারবে না, তা-ও যুক্তিসংগত নয়। ২০০৬ সালে বিরোধী দলে থাকতে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক কিন্তু সংসদের বাইরেই সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে বসেছিলেন। এখন বসতে বাধা কোথায়? সেই আলোচনা তাঁদের ভাষায় ‘ক্ষমতাসীনদের অনড় অবস্থানের কারণে’ সফল হয়নি। এবারের ক্ষমতাসীনেরা একটু উদারতা দেখালে হয়তো সংসদের বাইরেও সংকটের সমাধান হতে পারে। বিএনপির চেয়ারপারসন জানিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক শব্দে সরকারের আপত্তি থাকলে নির্দলীয় অন্তর্র্বতী সরকারের অধীনেও নির্বাচন হতে পারে। আর সরকারি দলের নেতারা বলছেন, কোনোভাবেই অনির্বাচিত ব্যক্তিদের ক্ষমতায় আনা যাবে না।
অতএব আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষই তাদের যুক্তি তুলে ধরতে পারে। আলোচনার বিকল্প হলো সংঘাত। আমরা অতীতের রাজনৈতিক তিক্ততার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতে চাই, উভয় পক্ষ অনড় অবস্থানে থাকায় সে সময়ে সংলাপ সফল হয়নি, রাজপথে ফয়সালা হয়েছে। এতে চূড়ান্ত বিচারে কেউ লাভবান হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ ও জনগণ।
এবারও সেই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেশবাসী চায় না বলেই সরকার ও বিরোধী দলকে আলোচনায় বসতে হবে। এবং সংসদের আগামী বাজেট অধিবেশনে তার সূচনা হতে পারে। আর সংলাপের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদেরই যে এগিয়ে আসতে হবে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংসদ অধিবেশনের আগে বিরোধী দলের নেতাদের নামে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ায় আলোচনার পরিবেশ অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত করবে সন্দেহ নেই।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ ৪৫ জন বিরোধীদলীয় নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের ঘটনাকে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবেই দেখছে পর্যবেক্ষক মহল। আবার তড়িঘড়ি করে অভিযোগপত্র তৈরি করার বিষয়টিকে সরকারের প্রতিহিংসাপরায়ণতা বলেও মনে করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, মির্জা ফখরুলসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়নি। এরই মধ্যে বিএনপির নেতারা পুলিশের অভিযোপত্রটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এটি একটি ফরমায়েশি অভিযোগপত্র এবং বিরোধী দলের আন্দোলন থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নেয়াই এর উদ্দেশ্য। আমরাও মনে করি, বিরোধীদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, তা সরকারের সুবিবেচনার লক্ষণ নয়। এতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাড়বে ও পরস্পরের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হবে। বর্তমানে দরকার ছিল, বিরোধী দলের সঙ্গে একটা আপসের সম্পর্ক তৈরি করা যা দুই প্রধান দলের মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। বস্তুত এ দাবি শুধু দেশের সাধারণ মানুষেরই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোও একই কথা বলছে। ইলিয়াস আলী ইস্যুতে বিরোধী দল এমনিতেই উত্তপ্ত হয়ে আছে, বর্তমান অভিযোগপত্র সেই উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে তুলবে সন্দেহ নেই। নির্যাতন-মামলা ইত্যাদি দিয়ে যে বিরোধী দলের আন্দোলন ঠেকানো যায় না, এ তো আমাদের অভিজ্ঞতায়ই রয়েছে। তাছাড়া সাধারণ মানুষও হয়রানিমূলক কোন পদক্ষেপ পছন্দ করে না। অভিযুক্তরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনার সঙ্গে জড়িতÑ এ কথাও সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করানো কঠিন। হরতালের সময় বিচ্ছিন্ন অনেক ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে থাকে। অতি উৎসাহীরাই ঘটায় এসব। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই দায়িত্বশীল নেতাকর্মী। তারা গাড়ি পোড়ানোর কাজে অংশ নেবেন কিংবা তাতে ইন্ধন জোগাবেন, তা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। সরকার কি তাহলে এটাই চাইছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আলটিমেটাম যেহেতু ঘনিয়ে আসছে, সেহেতু তার আগেই বিরোধী দলকে এমনভাবে দুর্বল করতে হবে যে, তারা যেন আন্দোলন চাঙ্গা করতে না পারে? সরকার একদিকে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করছে, অন্যদিকে তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। সর্বশেষ বিশেষ বিবেচনায় সরকারি দলের সুপারিশে ৫ শতাধিক মামলা প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। যেসব মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে খুনের মামলাও রয়েছে অনেক। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলীয় বিবেচনায় এযাবৎকাল যতগুলো মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং আগামীতে যে মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করা হবে। অর্থাৎ সরকার আগামী দিনের রাজনৈতিক সংকটের বীজ বপন করে চলেছে বলা যায়।
আমরা চাই, যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের বিচার হোক। আর যারা নিরপরাধ, হয়রানি থেকে তাদের মুক্ত রাখতে হবে। মনে রাখা দরকার, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার। এ ধরনের সরকার যা খুশি তা-ই করতে পারে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ সরকারের জবাবদিহিতার কোন বালাই নেই, রাজনৈতিক স্বার্থে যখন যা প্রয়োজন, তাই করে যাচ্ছে তারা। বর্তমান সরকারের প্রতিহিংসাপরায়ণতা আগামী দিনে বিরোধী দল ক্ষমতায় গেলে তাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হবে। অর্থাৎ প্রতিহিংসাপরায়ণতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতা হিসেবেই থেকে যাবে। সুতরাং সরকারের উচিত হবে, এমনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করা, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয় সময়েই সমাজে সুস্থিরতা বিরাজ করে। বিরোধী দলের প্রতি বৈরিতার সম্পর্ক তৈরি করে এটা অর্জন করা সম্ভব নয়। আমরা আশা করব, সরকারপক্ষ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে দুটি মামলা দায়ের করেছে, পুনর্বিবেচনা করে সেগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। একটি মামলার অভিযোগপত্র এখনও তৈরি করা হয়নি। অভিযোগপত্র তৈরির আগেই মামলাটি প্রত্যাহার করা উত্তম। মামলা দুটিতে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের কারাদণ্ড হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠবে। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তখন অসুবিধা যা হওয়ার সরকারেরই হবে। তবে
আমরা হরতালে বাসে আগুন বা বোমা নিক্ষেপ করে জনজীবনে আতঙ্ক ছড়ানোর তীব্র নিন্দা করি। তাই বলে গয়রহ বিরোধী দলের নেতাদের ওপর সেই ঘটনার দায় চাপানো সমীচীন নয়। এতে আসল সন্ত্রাসীদের পার পেয়ে যাওয়া এবং রহস্য অনুদ্ঘাটিত থাকার আশঙ্কাই বেশি। দমন-পীড়ন বা জ্বালাও-পোড়াও নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। (মুহম্মদ আলতাফ হোসেন জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বিএনএস’র চেয়ারম্যান)

0 Comments