বিশেষ প্রতিবেদক:
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর যেমনি হবে তেমনি বিমান বন্দরের জমি সংলগ্ন ক্ষতিগ্রস্থ লোকজনের পুনর্বাসনও যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হবে। বিমান বন্দরের সম্প্রসারণ কাজটিও হবে ধাপে ধাপে। তড়িৎ কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে এলাকাবাসীকে এজন্য যেমনি উচ্ছেদ করা হবে না তেমনি রাতারাতি শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের এতবড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নও অসম্ভব ব্যাপার। তবে ৩১ টি পরিবারকে অতি শীঘ্রই চরপাড়া এলাকার একটি নির্দ্দিষ্ট এলাকায় সরিয়ে নিয়ে রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ শুরু করা হবে। এ কাজের জন্য রয়েছে ৫০০ কোটি টাকারও বেশী বরাদ্দ। কক্সবাজার বিমান বন্দর সম্প্রসারণ কাজে সহযোগিতা দেয়ার উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটির গতকাল অনুষ্টিত এক গুরুত্বপুর্ণ সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জয়নুল বারীর সভাপতিত্বে অনুষ্টিত সভায় কক্সবাজার বিমান বন্দরের সম্প্রসারণ কাজে স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটন শহরের নানা শ্রেণী পেশার মানুষের অব্যাহত সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। সভায় বলা হয়, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পটি এমন কোন প্রকল্প নয় যা মাত্র কয়েক মাস বা কয়েক বছরে শেষ করা হবে। এটি কয়েকটি ধাপে এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এখন শুরু হবে মাত্র রানওয়ের কাজ। রানওয়ের কাজ শেষ হতেও সময় দরকার হবে বেশ কয়েক বছর। সুতরাং এলাকার লোকজনকে অহেতুক উচ্ছেদ আতংকে না থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সভায় কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, বিমান বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হাবিবুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ্যাডভোকেট এ,কে আহমদ হোছাইন, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম চৌধুরী, যুগ্ন সম্পাদক এ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী, পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডভোকেট মমতাজ আহমদ, কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমান ও সহ সভাপতি সাইফুল ইসলাম, বিশিষ্ট ঠিকাদার আতিকুল ইসলাম সিআইপি এবং বিমান বন্দর ম্যানেজার হাসান জহির বক্তব্য রাখেন।
এলাকাবাসীর দাবীর সমর্থনে স্থানীয় রাজনীতিবিদগন সভায় বলেন, বর্তমান গনতান্ত্রিক সরকার কোনভাবেই এলাকার লোকজনের সর্বনাশ করে বিমান বন্দর করার পক্ষে নয়। তদুপরি বিমান বন্দরের জন্য আদৌ নতুন করে ৬৮২ একর জমির দরকার পড়ে কিনা সেটাও এলাকাবাসীর জানার দরকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর কক্সবাজার শহরের বর্তমান স্থান থেকে সরিয়ে খুরুশকুলে নেয়া যায় কিনা বা চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সাথে কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ সহজ করে কক্সবাজারের বিমান বন্দরের প্রয়োজনীয়তা মিটানো যায় কিনা এবং এলাকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদ না করে অত্যন্ত কম পরিমাণ জমিতে আন্তর্জাতিক মানের বিমান বন্দর করা যায় কিনা সহ এলাকাবাসীর ইত্যকার দাবী দাওয়ার বিশদ তুলে ধরা হয়। এমনকি সাম্প্রতিক কালে ঘন ঘন সুুনামি সতর্কতার কারনে বিমান বন্দরের নিরাপত্তার কথাও তুলে ধরা হয়।
সভায় উপস্থিত রাজনীতিবিদদের এসব প্রশ্নের জবাবে বিমান বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হাবিবুর রহমান জানান, কক্সবাজারের ৭০ বছর আগে স্থাপিত বিমান বন্দরটিকে আন্তর্জাতিক মানের করা যায় কিনা আগে সেই সম্ভাব্যতার বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে। এ জন্য বিশ্বব্যাপি বিমান বন্দরের স্থাপনার কাজে সুনাম রয়েছে এরকম একটি সংস্থাকে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই সংস্থা দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে সরেজমিন কাজ করে সরকারকে জানায়-বিগত দুইশত বছরের সামুদ্রিক ঝড়-ঝঞ্জার ইতিহাস পর্যালোচন্ াকরে দেখা গেছে কক্সবাজার বিমান বন্দর এলাকা কোনদিন ভাংগনের শিকারে পড়েনি। একারনে সরকার বর্তমান স্থানে বিমান বন্দর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি খুরুশকুলেও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাও আগামী দুইশত বছরের পরিকল্পনা নিয়েই কক্সবাজারের এই বিমান বন্দর প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কারনেই সরকার নতুন করে ৬৮২ একর জমি বিমান বন্দর সম্প্রসারণের জন্য নিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি জানান। সোনাদিয়ায় যে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপিত হতে যাচ্ছে সেই বন্দরের জন্যই কক্সবাজার বিমান বন্দরের গুরুত্ব রয়েছে অত্যধিক।
বিমান বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) সভায় বলেন, একটি
আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর কেবল কয়েক একর জমি দিয়ে স্থাপিত হয় না। তবে দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম পরিমাণ জমি নিয়ে কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। অথচ রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরের জন্য নেয়া হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ একর অনুরুপ চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দরের জন্য নেয়া হয়েছে ২ হাজার ৭০০ একর জমি। সিলেট আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সহ অন্যান্য বিমান বন্দরগুলোর জমিও প্রায় অনুরুপ। অর্থাৎ কক্সবাজার বিমান বন্দরের জন্য নেয়া হচ্ছে মাত্র এক তৃতীয়াংশেরও কম জমি। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে পিডি সভাকে জানান, ৩১ পরিবারের সদস্যদের আপাতত একটি স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। সেখান থেকে পরে পুনর্বাসন করা হবে। রানওয়ের কাজ শেষ হতে কয়েক বছর সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি বলেন, দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবার জন্য কোন সরকার বিমান বন্দর করতে যায় না। বিমান বন্দর অবশ্যই লাভের জন্য করা হয়। মাত্র কয়েক বছর আগেও কক্সবাজার বিমান বন্দরে আসা যাওয়া করত সাপ্তাহিক তিনটি বিমান। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন দৈনিক তিনটিরও বেশী বিমান আসা যাওয়া করে। এ কারনেই বিমান বন্দর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তারপরেও বিমান বন্দরের পরবর্তী সম্প্রসারণের কাজ নির্ভর করবে ব্যবসার ভাল-মন্দের উপর। যদি কিনা নতুন রানওয়ের পর ব্যবসা ভাল হয় তখন বিমান বন্দরের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নের কাজ হাতে নেয়া হবে অন্যথায় নয়। সভায় উপস্থিত সবাই বিমান বন্দরের কাজ নিয়ে পিডির দেয়া তথ্যে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সভায় এলাকার লোকজনদের নানা গুজবে কান না দেয়ার পরামর্শ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে, সরকার ও বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের নানা সিদ্ধান্ত সর্ম্পকে স্থানীয় বাসিন্দারা যাতে স্বচ্ছতার মাধ্যমে যাবতীয় তথ্য পেতে পারেন এ জন্য এলাকাবাসীর প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সেই সাথে কক্সবাজার বিমান বন্দরের পার্শ্ববর্তী এলাকার কোন বাসিন্দাকে নোটিশ না দেয়ার জন্যও কর্তৃপক্ষকে বলে দেয়া হয়েছে।

0 Comments