সৈয়দ আবদুর রহমান
আধুনিক বিশ্বে এমন কোনো মুসলিম দেশ নেই, যে দেশে পাশ্চাত্যের নারী স্বাধীনতাবাদীদের মারাত্মক প্রচারণার শিকার হয়নি এবং পর্দাপ্রথাকে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় বিধানরূপে
চিহ্নিত করেনি। তার ফলে পাশ্চাত্য অপশক্তি বিশ্বের বুক থেকে মুসলিম জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যত ধরনের চক্রান্তের জাল তৈরি করেছে তন্মধ্যে মুসলিম নারীদের উলঙ্গ করা ও তাদের গণধর্ষণের শিকার করা অন্যতম ষড়যন্ত্র। কিছুদিন আগে আমাদের দেশের স্কুল কলেজের ছাত্রীদের ধর্ষণের কী না নির্লজ্জ ঘটনা ঘটে গেল। পত্রপত্রিকা ও জনমুখে এখনো তার আলোচনা সমালোচনা শেষ হয়নি। এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষণজনিত কারণে নারীরা মৃত্যুবরণ করছে। পত্রিকায় এসব খবর আংশিক ছাপা হলেও সব খবর ছাপা হচ্ছে না।
পৃথিবীর সর্বত্র নারী স্বাধীনতার গলাবাজি করা হয়, বড় বড় নারী সম্মেলন হয়। আমাদের দেশেও নারী স্বাধীনতা ও নারী অধিকারের নামে আন্দোলন হচ্ছে, তথাকথিত নারীবাদিরা লম্বা লম্বা বিবৃতি দিয়ে মাঠ গরম করছেন। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে এক ঘণ্টার জন্যও কি নারী নির্যাতন বন্ধ হয়েছে এরকম কোন প্রমাণ নাই। আমাদের দেশের সরকার প্রধান ও বিরোধী দলের প্রধান দু’জনই নারী। তারা পারছেন না নারী নির্যাতন বন্ধ করতে। দিন দিন বরং এ রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিন দিন নারী নির্যাতনের তালিকা দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হচ্ছে। পত্রিকায় পড়েছি ইয়াসমিনের মতো নিষ্পাপ যুবতী প্রাণ নিয়ে বাসায় ফিরে যেতে পারেনি। চট্টগ্রামের ঝাউতলায় তের বছরের কিশোরী নাজমা ধর্ষিতা হয়েছে। বরিশালের কোহিনূর আক্তার কণা, ঈদের ছুটি ভোগ শেষে ঢাকা আসার পথে সেখানকার বাসস্ট্যান্ডের কাছে সাত পাষন্ডের ধর্ষণের শিকার হয়। লালবাগ এলাকার স্কুল ছাত্রী রেহানা ধর্ষিত হওয়ার খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এভাবে প্রতিদিনের পত্রিকার পাতায় যেভাবে নারী নির্যাতনের খবর ছাপা হচ্ছে তা এক এক করে বলতে গেলে এই নিবন্ধের ইতি টানতে মাসের পর মাস লাগবে । এই দেশের ইসলামী শিক্ষিত আলেম-ওলামারা মনে করেন যে,এ সকল নারী হত্যা, ধর্ষণ, ও , এসিড নিক্ষেপ তথা নির্যাতনের আর্থসামাজিক কারণের পাশাপাশি অন্যতম কারণ হচ্ছে ইসলামের ফরয পর্দা লঙ্ঘনজনিত কারণ। যেহেতু ইসলামে শালীনতার কথা পর্দার কথা বলা হয়েছে সেহেতু এই পর্দা দ্বারা নিজের ইজ্জত-আব্রুকেই হেফাজতের তাগিদ দেয়া হয়েছে মসুলমান নর-নারীদের। অথচ আমাদের দেশে কোন কোন মা-বোন পর্দার পড়ার ব্যাপারে যথেষ্ট গাফিলতি করেন। অনেকে ইসলামী পর্দাসীন হওয়াকে মধ্য যুগীয় প্রথা বা নারী নির্যাতনের মাধ্যম বলে মনে করেন। আমাদের দেশে সুশীল সমাজের মধ্যে বসবাসরত কিছু নারীদের পর্দাহীন বা বেপর্দা চলাচলের যে প্রবনতা চালু হয়েছে এর প্রধান কারণ হচ্ছে, আকাশ সংষ্কৃতি বা বিদেশী বিধর্মীর বেপরোয়া জিবনাচার টেলিভিশন চ্যানালের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত দর্শন করা। যা কুফল নিজেদের নগ্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে দেশে নারী নির্যাতন, ইভটিজিং ও ধর্ষন আশ্কংাজনক হারে বেড়ে চলেছে।
জাতীয় অনেক ঘটনার মূল অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, নারী নির্যাতনের পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পর্দা লঙ্ঘনজনিত কারণই বেশি। নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও এসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনার মূল প্রতিক্রিয়ার সূচনা ঘটে যুবতী মহিলার অপর যুবক পুরষের সাথে অবৈধ মেলামেশার সুযোগ থেকে। পর্দা লঙ্ঘন করে পর পুরুষের সাথে অবাধে আলাপ মতবিনিময়, সহশিক্ষা, সহচাকরি, সহক্রীড়া ইত্যাদি উপলক্ষ করে বিষয়টি আস্তে আস্তে শেষ পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। সুতরাং পর্দার বিষয়টিকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবেই বিচার করা যাক না কেন ফ্রি স্টাইল-এর বিষময় পরিণতি যে বর্তমানে দেশে বিদেশে সর্বত্র নগ্নভাবে ধরা পড়েছে এবং নারীদেরকে ধ্বংসের দ¦ার প্রান্তে যে নিয়ে যাচ্ছে,তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
আমাদের দেশে আধুনিকতার নামে যেসব পরিবার নারীদের পর্দাকে এক সময় সেকেলে বলে জাতে উঠতে ব্যস্ত ছিলেন, বর্তমানে ওই জাতীয় পরিবারে প্রায় স্বামী-স্ত্রীর ভুল বুঝাবুঝি, মেয়েদের পিতামাতার অবাধ্যতা ও যার-তার সাথে মেলামেশার তিক্ত অভিজ্ঞতা সুস্পষ্ট।
এখানে পত্রিকা থেকে পাওয়া একটি কথা উল্লেখ করা যায়, বিপ্লব উত্তরকালে চীনের মাও সেতুং বেইজিং এ এক যুব সম্মেলনে তরণীদের একথা বলে হুশিয়ার করে দিয়েছিলেন যে, তোমরা টাইট ফিট পোশাক পরিধান করবে না। কেননা তোমাদের দেখে আমার যুবকদের কাজের প্রতি মনোযোগ নষ্ট হয়ে যাবে। অতি সম্প্রতি ফিলিপাইনের সিভিল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান প্যাটারিসিয়া স্টোটোমাস বলেছেন, মিনিস্কার্ট, উগ্র মেকাপ এবং রকমারী গহনা সরকারি কর্মকর্তাদের চিত্ত বিহ্বল করে দেয়। তাই সরকারি সংস্থা ও অফিসে এ সাজসজ্জা নিষিদ্ধ। এক বেতার সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মহিলারা এমন পোশাক পরিধান করতে পারবেন না যাতে শরীরের বিশেষ উত্তেজক স্থান প্রদর্শিত হয়। মহিলারা সংক্ষিপ্ত পোশাক পরিধান করলে তাদেরকে ইজ্জত আব্রু ঢেকে রাখার জন্য সারাদিন কাপড় ধরে টানাটানি করতে হয়। হাফপ্যান্ট, জিন্স শরীর চর্চার পোশাক ও কাঠনির্মিত তালি দেয়া জুতা সরকারি কর্মজীবী মহিলাদের জন্য উপযোগী নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আমাদের দেশে নারীদের পাশাপাশি কিছু কিছু পুরুষ নারীদের নগ্ন অধিকারের জন্য এমনভাবে কথা বলেন যেনো তারা নারীদের চেয়ে দ্বিগুন নারী। অথবা নারী হতে না পারা তাদের জন্য বড়ই আপসোসের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে । যে সব পুরুষ পুনজম্মে বিশ্বাসী তারা হয়ত জিবনান্দ দাসের ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটিকে বিক্রিত করে বলবে ‘ আবার আসিব ফিরে ধান সিড়িতির তীরে কুত্তা-বিলাই-বাঘ-ভল্লুক-কাক-চিল উল্লুক-মল্লুক হয়ে নয়, ঐশ্বরিয়া-ক্যাটরিনা-জোলি-ফুলন দেবী বা শাকিরার বেশে...’। কারণ, তারা চায় নারীদের হাটা-চলা যেনো নগ্ন থেকে আরো নগ্ন হয়। এতে তারা নারীদের কল্যাণতো চায়না বরং নারীদের ইহকাল-পরকালই ধ্বংস করে দিতে চায়। আধুনিক সভ্যতা বলতে পাশ্চাত্য সভ্যতাকেই বুঝায় এবং এ সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘খাও দাও ফূর্তি কর’। নগ্নতা নির্লজ্জতা ও উলঙ্গপনা সভ্যতার মাপকাঠি। যে যতটা উলঙ্গ হতে পারে সে তত বেশি সভ্য ও প্রগতিশীল। তারা চায় বর্তমান সভ্যতার বাহাদুরী এখানে, কে কতটুকু দেহ অনাবৃত করতে পারলো। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা নামে সারা দুনিয়ায় তাবৎ সুন্দরীদের এনে লাখো জনতার সামনে উলঙ্গ করে তাদের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নগ্নভাবে তুলে ধরাই তাদের কাছে সভ্যতা। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা স্ব স্ব বিবস্ত্র শরীর বিচারক ও দর্শকদের সামনে নানা ভঙ্গিতে প্রদর্শন করে সেরা সুন্দরীর মুকুট লাভের চেষ্টা করে, ক্যামেরার বদৌলতে দুনিয়ার মানুষ অপ্সরীদের এসব নগ্ন দেহ দর্শনে পুলকিত হয়। হায়রে সভ্যতা। এটাই আধুনিক সভ্যতা। সভ্যতার বদৌলতে নারী আজ পুরুষের প্রাইভেট সেক্রেটারি, উলঙ্গ মডেল কন্যা, অশালীন বেহায়া বেশরম, প্রতারিত, জেনাকারিণী, পুরুষের যৌন ক্ষুুধা নিবৃত্তির সামগ্রী, অঙ্গ প্রদর্শনীর বস্তু, ইজ্জত ও সম্ভ্রম বর্জিত, পিতৃপরিচয়হীন সন্তানের জননী। সভ্যতার দোহাই দিয়ে উদোম শরীরে নেচে গেয়ে একে অন্যকে চুমু খেয়ে দর্শকের মনে সুড়সুড়ি দিয়ে কেউ কেউ শিল্পী নামে অভিহিত হয় এবং জ্ঞানী-গুণীদের সমাবেশে তারা পুরস্কৃত হয়। কোন পতিতা বা পতিতালয়েরর বিরোদ্ধে সমাজের-দেশের সচেতন ও নারী নেত্রীরা বা কোন নারী সংঘটন কেন পতিবাদ করে না, তা আমাদের মাথায় আসে না। নারীরা কেন পতিতা হবে? কেন তারা এই পেশা বেছে নেবে? আয় রোজগারের কি অন্য কোন উপায় নেই? পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায় খদ্দেরসহ এতজন পতিতা গ্রেপ্তার। এর চেয়ে বড় দুঃখের খবর আর কি হতে পারে। ভালো কাজ করে স্বাবলম্বি হয়েছে এরকম অনেক নারী চরিত্র ্আমাদের আশেপাশেই আছে। খারাপ পথে পা দেয়া সেটা অনেকে জেনেশুনে দেয় আর অনেকে চাপে পড়ে দেয়। যারা এই চাপ সৃষ্টি করে সমাজে নারীদের নগ্ন ও অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায় তাদের দেশের প্রচলিত আইনে গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম প্রবক্তা হচ্ছেন মার্কস ও এঙ্গেলস। ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত তাদের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো গ্রন্থে তারা লেখেন, “গৃহ ও পরিবার একটি অভিশাপ বিশেষ। কেননা এটা নারীকে চিরস্থায়ীভাবে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখে। তাই নারীকে গৃহের বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিতে হবে এবং কলকারখানায় সার্বক্ষণিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।”
পরবর্তী নারীবাদী প্রবক্তারা সহশিক্ষা, ঘরের বাইরে একই কর্মস্থলে সহকর্ম অবস্থান, সামাজিক অনুষ্ঠানে নারী পুরুষের একত্র মিলন, অর্ধনগ্ন পোশাকে বিবাহপূর্ব প্রেম অভিসার ও যৌথ সামাজিক অনুষ্ঠানে পদপানে ও নৃত্য গানের মাধ্যমে অবাধ যৌনাচারের সুযোগ দানের জন্য জিদ ধরেন। এ ক্ষেত্রে তারা সরকারি ব্যবস্থাপনায় জন্মনিরোধ সামগ্রী, বন্ধ্যাকরণ ব্যবস্থা, অবাঞ্ছিত গর্ভ বিমোচনের দাবি করে। তাদের এ নারী স্বাধীনতা আন্দোলনকে ‘নগ্নউন্মত্ততা’ আখ্যায়িত করে বিশ্ববিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী দার্শনিক মনীষী প্রুডেন বলেন, ‘নারী স্বাধীনতা আন্দোলন নগ্ন উন্মত্ততা ছাড়া আর কিছুই নয়। এরা আজ এমন উন্মত্ততায় মেতে উঠেছে যে, তারা তাদের মূল্য বুঝার ও দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের বাড়াবাড়ির সীমা ছাড়িয়ে গেলে পরিণামে পূর্ণ দাসী বৃত্তিই তাদের ভাগ্যে ফিরে আসবে।
বিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়েছি একজন মনীষী ম্যাডাম ডাফরিনো বলেছেন, ‘নারীরা দিন দিন বিভিন্ন ক্ষেত্রে যতই উন্নতি লাভ করছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা যতই এগিয়ে চলছে, পুরুষরা ততই তাদেরকে তালাক দিয়ে চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’ বিখ্যাত সমালোচক প্রফেসর জিউমফিয়ার এর মতে, ‘সমাজজীবনের মূলনীতি দাম্পত্য জীবনের প্রতি নারীদের তীব্র ঘৃনা রয়েছে। বিশ্বস্রষ্টা যে উদ্দেশ্যে তাদের সৃষ্টি করেছে এবং যে কাজের ভিত্তিতে তাদের শারীরিক ও মানসিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করেছেন তারা ভুলে গেছে। এদের অবস্থা এমন শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তাকে মস্তিষ্ক বিকৃতি বলে অভিহিত করা উচিত। বস্তুত এদের পুরুষ বলা যায় না, নারীর নমুনা হওয়ার কারণে এবং স্বভাবগত গঠন প্রণালীগত ভিন্ন শ্রেণীভুক্ত হওয়ার দরুন। কিন্তু তাদের কার্যক্রম ও পেশা নারীর স্বভাবগত কর্তব্য ও দায়িত্বের পরিপন্থী বিধায় এরা নারী নয়। নারীদের এ মর্মান্তিক অবস্থা যদি আরো কিছুকাল এভাবেই বহাল থাকে, তবে ধরে নিতে হবে, অদূর ভবিষ্যতে এমন এক বিরাট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে যা সভ্যতা ও সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তিমূলকে টলটলায়মান করে দিবে।’
এ জন্যই পদার্থ বিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় গ্রন্থকার জন সাইমন বলেছেন, নারীর উচিত নারী থাকা। হ্যাঁ অবশ্যই! নারী থাকাই নারীর কর্তব্য। এতেই তার কল্যাণ নিহিত রয়েছে এবং এ গুণটি তাকে পুণ্যের লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে পারে। ইহা প্রকৃতির বিধান।’
নারী যতই এ বিধানের নিকটবর্তী হবে, ততই তার মানমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আর যতই এ বিধান থেকে দূরে সরবে ততই তার বিপদাপদ বৃদ্ধি পাবে। কোনো নারীই তার শ্রেণীগত আওতার বাইরে পা বাড়াতে পারে না। কেন না নারী নারীই। নারী স্বগৃহের বাইরে যখন দুনিয়ার অন্যান্য কাজকর্মে অংশগ্রহণ করে, পুরুষের সেক্রেটারি হয়, পণ্য বিক্রেতা-সেলসম্যান হয়, ফ্যাশন শোর অভিনেত্রী ও বিজ্ঞাপনের মডেল সাজে, পুরুষের পাশে বসে কর্মপরিচালনা করে, মিছিল-মিটিংয়ে যোগদান করে, নিজকে লোকালয়ে প্রদর্শন করে, কড়া মেকআপ করে অবাধে বিচরণ করে, জরায়ুর স্বাধীনতা চায়, বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে, আমার শরীর আমার না, এমন কথা মানবো না, শরীর আমার সিদ্ধান্ত আমার, আমার শরীর আমার মন, তাতে কেন অন্যজন ইত্যাদি স্লোাগান দেয়, তখন সে আর নারী থাকে না।
আধুনিক সভ্যতা মানেই নগ্ন সভ্যতা। মানে বেহায়াপনা ও ছিলানি সভ্যতা। এ ছিলানি সভ্যতার হাওয়া বইছে সবখানে। টিভি নেটওয়ার্কে এখন প্রত্যহ বয়ে যাচ্ছে সেক্সি সেক্সি হাওয়া। ডিস কালচারের বদৌলতে আজ প্রাচ্য-পাশ্চাত্য একাকার। এখন টিভি নেটওয়ার্ক মানেই আকাশ কালচার, ডিশ কালচার। আমাদের চারদিকে এ ডিশ কালচার বিশ্ব কালচারে রূপ নিচ্ছে। কিন্তু এ আকাশ কালচার, ডিশ কালচার তথা বিশ্ব কালচারের নামে টিভির মিনি পর্দায় চলছে ফ্রি সেক্সের অবাধ চর্চা। আমরা এখন যৌবন ও যৌনতার চর্চায় ভেসে যাচ্ছি। ভেসে যাচ্ছি নগ্নতা নামক এক সোনার তরীর স্রোতের টানে। আমাদের টিভিতে বিশেষ করে এর বিজ্ঞাপনের ভাষায় চলছে যৌনতার বিকাশ ও চর্চা। ‘আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই’ এ ভাষার মাঝে প্রচ্ছন্নভাবে যৌনতার অর্থই প্রকট হয়ে ওঠে। সেখানে রয়েছে সেক্সের প্রথম আকর্ষণ। আমাদের দেশে টিভিতে এখন নাটক প্রচার করা হয় ‘ছি. ছি. ছি. তুই এত খারাপ’ নামে।এর বদৌলতে বখাটেরা রাস্তাঘাটে মেয়েদের উৎপাত কর্মে আরো এক ধাপ প্রমোশন পায়। এর শিকার হয় শহর ও গ্রামের সহজ-সরল-কিশুরি-বলিকা ও নারীরা। এমন বিজ্ঞাপনও প্রচারিত হয় টিভিতে। একদল স্কুলের ছাত্রী বই নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। পথের পাশে একদল ছেলে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হাতে ফুল নিয়ে অগ্রসর হয়ে বলে, ফুল নিবে ফুল! ছাত্রীরাও কোমর দুলিয়ে মাথার বেনী নাড়িয়ে বলে- না না. মাথায় আমার চাঁপা মাখা, চাইনে চাঁপা ফুল।’
নারী হলো ভোগ্য পণ্যের বিজ্ঞাপন, তাও আবার স্কুলের ছাত্রী। এ হলো নারী প্রগতির ফসল, নারী আন্দোলনের অগ্রগতি। বেতার কেন্দ্রগুলোও এ বিষয়ে পিছিয়ে নেই। যৌন সুড়সুড়ি দিয়ে যে সমস্ত গান পরিবেশন করছে অহরহ তা শুনলে কানে আঙ্গুল দেয়া ছাড়া উপায় নেই। অতি সম্প্রতি মোবাইল ফোনের কল্যাণে (!) যৌন সুড়সুড়ি দেয়ার কাজটি আরো ব্যাপকতা লাভ করেছে। মাঠের কামলা, রিকশাওয়ালা, ভ্যান চালক ও স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের হাতে হাতে মোবাইল আর সে মোবাইলে অনবরত বাজছে এই সমস্ত গান-‘ পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে খোঁজে পেয়েছি, মনে হয় তোমাকে আমি জনম জনম ধরে পেয়েছি’ বা ‘মনটা যদি বদল করো স¦র্গের আশা ছেড়ে দেবো...’ এই জন্য বখাটেরা পথে-ঘাটে মেয়েদেরকে টিজ করে বা অপহরণ করে, হত্যা বা ধর্ষন করে ‘স্বর্গের আশা’ ছেড়ে দেয়। এমনকি ‘স্বগের আশা’ ছেড়ে দিয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারী (২০১২) ভালোবাসা দিবসে গোপালগঞ্জে গিয়ে ২৮০ ফুট উচু মোবাইল টাওয়ারের ওপর থেকে লাফিয়ে স্কুল পড়–য়া প্রেমিক-প্রেমিকা আত্মহত্যা করে নরকের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। এই প্রেমিক-প্রেমিকারা প্রতিনিয়ত শুনে যায় - ‘ পৃথিবীতে প্রেম বলে যদি কিছু থেকে থাকে তার নাম ভালোবাসা তার নাম প্রেম, জ্বলে পুড়ে মরার মাঝে যদি কিছু থেকে থাকে তার নাম ভালোবাসা তার নাম প্রেম....’। আর কতগুলো গান আছে যা দাম্পত্য জিবনে অশান্তি আনে । যেমন ‘ যদি না আস বাড়িতে আগুন জ্বালাইয়া দেব আমার শাড়িতে.., কিংবা ‘ মিন্টু ঘটকের কথা শুইনা, অল্প বয়সে করলাম বিয়া....পুলাতো নয় সেতো আগুনেরই গুলারে পুলাতো নয় সেতো আগুনেরই গুলা...’। এই সমস্ত গানের কারণে আজ সমাজে দেশে প্রেমের জন্য আত্মহত্যার প্রবনতা ও দাম্পত্য কলহ বেড়ে চলেছে। সমাজে উচু পরিবার থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা আজ প্রেমের জন্য আত্মহত্যা করে ‘স্বর্গের আশা’ ছেড়ে দিচ্ছে। এমনকি পরকিয়া প্রেমের জন্য নিজের গর্বজাত সন্তানকে পর্যন্ত হত্যা করতে দ্বিধা করছে না এই অবৈধ ও নগ্ন প্রেমজীবীরা। যা আমাদের সমাজে বড়ই মর্মান্তিক পরিস্থিতির আবতারনা করে চলেছে প্রতিদিন। আধুনিক সভ্যতার নামে আমরা ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছি এক ধরনের জীবন বিধ্বংসী কর্মকান্ড ও বেহায়াপনার দিকে । আর একটা গানের কথা এখানে উল্লেখ করতে হচ্ছে । গানের প্রথম কয়েকটি লাইন এই রকম-‘ পড়ে না চোখের পলক , কি তোমার রূপের ঝলক, দোহাই লাগে মুখটি তোমার একটু আচঁলে ঢাক, আমি জ্ঞান হারাবো মরে যাব । বাচাঁতে পারবে কেউ...। এই গানে মাধ্যমে আচঁল দিয়ে মুখ বা নিজেকে তারাতারি ঢেকে ফেলতেই বলা হয়েছে। তা না হলে শিল্পী বা প্রেমিক বেহুশ হবে বলে হুশিয়ার করে দিয়েছে। কারণ তাকে ঐ রূপ দিশেহারা করে দিতে পারে। অর্থ্যাৎ অশ্লীলভাবে হলেও এই গানের মাধ্যমে এখানে পর্দার কথাই বলা হয়েছে । ঐ রূপ পর পুরুষের কাছ থেকে ঢেকে রাখতেই বলেছেন শিল্পী। কারণ নিজেকে পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখলে নিজেও রক্ষা পেল আর অন্যকেও বেহুশ হতে হবে না। এই গানের কতা দিয়ে প্রমানিত হলো যে, নিজের ইজ্জত আব্রু সুরক্ষার জন্য পর্দার কোন বিকল্প নেই। যদিও প্রগতিশীল নামধারীরা এই যুক্তি মানবে না। কারণ তারা পর্দাকে এক প্রকার নারী নির্যানের হাতিয়ার মনে করেন।
আর এখন সুন্দরী প্রতিযোগীতার মতো অশ্লীল ও বেহায়না প্রতিযোগতিাও আমাদের দেশে হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশ, কয়েক বছর (৯৫ সালে) মিস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতার একজন প্রতিযোগিনী নাকি অভিযোগ করেছিলেন ,আয়োজকরা সুইমিং কাস্টিউম তথা সংক্ষিপ্ত পোশাকে এবং একান্তভাবে প্রতিযোগীদের শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখার জন্য ব্যাকুল থাকেন। সুন্দরী প্রতিযোগিতার চেয়ে উদ্যোক্তাদের অনেকে প্রতিযোগীদের সান্নিধ্য লাভেই নাকি বেশি ব্যস্ত থাকেন। এছাড়া দামি দামি উপঢৌকনের মাধ্যমে এক সুন্দরীর মন পাবার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিল অনেকে। হালে আমাদের বিাপন মডেলের এ ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সর্বদা পাঁচতারা হোটেলে চলছে মডেল কন্যাদের চোখ কাড়া ক্যাটওয়াক। আমাদের দেশে আধুনিক ও প্রগতিশীল নামধারীরা তাদের কৃষ্টি-কালচারকে পশ্চিমাদের অনুকরণ করতেই বেশি আগ্রহী। অথচ এই পশ্চিমাদের নারীদের করুণ অবস্থা সম্পর্কে তারা তেমন ওয়াকিবহাল বলে মনে হয়া না।
পত্রিকায় প্রকাশ, আমেরিকায় প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে একজন নারী ধর্ষিতা হয়, ভারতে প্রতি ৫৪ মিনিটে একজন এবং বাংলাদেশে প্রতি ১২ ঘণ্টায় একজন। এ তথ্য ১৯ বছর আগের। সম্প্রতি এসব অপকর্মের হার বিশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের ওহঃবৎ জবমরড়হধষ পৎরসব. ঔঁংঃরপব জবংবৎধপয রহংঃরঃঁঃব প্রকাশ করেছে যে, লন্ডনে প্রতিবছর ৭৪ হাজার নারী তাদের উপর নির্যাতনের কারণে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়। অস্ট্রিয়ায় প্রতি বছরে প্রতি ৫২ জনের ১ জন মহিলা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়। সংবাদ সংস্থা ইতারতাস জানায়, রাশিয়ার প্রতি ১০০টি শিশু জন্মগ্রহণের পাশাপাশি গর্ভপাত ঘটায় ২১৭টি। সেখানে ৯ বছরে ৩০ লাখ গর্ভপাতের কথা তালিকাভুক্ত হয়। তন্মধ্যে শুধু ১৫ বছর নিম্ন বয়সী তিন হাজার বালিকার গর্ভপাত ঘটানো হয়। প্রতি ৪টি বিয়ের মধ্যে ১টি ভেঙে যায়। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক লাখ মহিলা ধর্ষিতা হয়। ১৯৯৮ সালে প্রায় দুই লাখ মহিলা ধর্ষিতা হয়। অন্য রিপোর্টে প্রকাশ, ইউরোপ ও আমেরিকায় শিল্প কারখানা শ্রমজীবী ১৪ বছর বয়সের কোনো মেয়েই তার সতীত্ব বজায় রাখতে পারে না। এ সবই হচ্ছে সেসব দেশের খন্ড চিত্র।
নারী স্বাধীনতা ও নারী আন্দোলনের পীঠস্থান পশ্চিমা দেশসহ সারাবিশ্বে নারী নিছক ভোগ এবং বিলাসের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। এ আন্দোলনের হোতারা লোভী কুকুরের মতো নারীর যৌবন লেহন করার নানাবিধ উপায় উপকরণ বের করেছে। শাড়ি, গাড়ি, জামা, জুতা, ছাতা, বেড, বিস্কুট থেকে শুরু করে সূচ, সুতা পর্যন্ত সকল প্রকার পণ্য দ্রব্যের বিজ্ঞাপনে উলঙ্গ নারী চিত্র। তাদের অপূর্ব ভঙ্গিমা, বিচিত্র হাসি, নগ্নবক্ষ এ গুলোকে বেশি প্রাণবন্ত করেছে। অথচ নারী স্বাধীনতার ধোঁকায় ফেলে তাদের রাস্তায় নামিয়ে তাদের সতীত্ব লুণ্ঠন করা হয়েছে। ১৯৫৫ সালে ফ্রান্সের মেডিকেল বোর্ড ঘোষণা করেছে সে দেশে একজনও সতী নারী নেই, আর এ জন্য ফ্রান্সের মানুষ গর্বিত। ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী সমগ্র দেশের প্রতি হাজারে বায়ান্নজন জারজ সন্তান জন্ম লাভ করে এবং কুমারী মাতারা দু’লাখ একুশ হাজার সন্তান প্রসব করে। এদের হার হাজারে দুইশত আশি।
নিউইয়র্কের হাইস্কুলগুলো থেকে ১৯৬১ সালে এক হাজার বালিকাকে অবৈধ গর্ভধারণের জন্য বহিষ্কার করা হয়। ইতালীতে তিন ঘণ্টায় একজন মেয়ে সতীত্ব হারায়। ফ্রান্সে প্রত্যহ দশ হাজার নারী চল্লিশ হাজার পুরুষের সঙ্গী হতে বাধ্য হচ্ছে। লন্ডনের জনস্বাস্থ্য বিভাগের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ডাক্তার ঋড়ংযশরহফড়বঃপয তার খড়ি ড়ভ ংবী গ্রন্থে লিখেছেন ‘লন্ডনে প্রতি দশে একটি করে জারজ সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। ইংল্যান্ডের জবমরংঃৎধং মবহবৎধষ এর ২৭ নং বিবরণীতে আছে, ইংল্যান্ডে রেজিস্ট্রিকৃত ৪০৪০ জন শিশুর জন্ম তালিকায় ৬৫ জন জারজ। ১৯৩৮ সালে শুধু নিউইয়র্ক শহরেই ১৩৪৭টি সদ্যজাত জারজ সন্তানের খবর পাওয়া যায়। এদের অধিকাংশই পনের বছরের কুমারী মেয়ে। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের অংশ বিশেষ মাত্র।
নারী নির্যাতনের মোকাবিলায় শুধুমাত্র ভাসা ভাসা কয়েকটি আইন আর বক্তৃতা দিলে কোনো কাজ হবে না। নারীদের জন্য ইসলামে অধিকারসহ সর্বোত্তম আইন রয়েছে। সে আইন গতিশীল শক্তিশালী এবং চিরন্তন সকল দেশের সকল যুগের সকল মানুষের জন্য কল্যাণকর। তাই নারী নির্যাতনের ষড়যন্ত্র থেকে নারীদের মুক্তি দিতে প্রয়োজন ইসলামী জীবন বিধান গ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠা। এক মাত্র ইসলামী সংষ্কৃতিই এই সুন্দর পৃতিবীতে শান্তি আনতে সক্ষম এই কথাকে বিশ্বাস করে আমরা আমাদের দেশের মা-বোন ও নারী অধিকারের জন্য সোচ্চার আধুনিক ও প্রগতিশীল পুরুষদের প্রতি বিনীতভাবে অনুরোধ জানাই যে আল্লাহর ওয়াস্তে নারীদেরকে ইসলামী পর্দার শিক্ষার দেই এবং আল্লাহর বিধান মতে ঘরে-বাইরে ইসলামী জীবণ ধারণের কাল্চার বা পরিবেশ ফিরিয়ে আনি। তা না হলে আল্লাহর বিচারের দিন প্রজম্ম আমাদের ওপর নিশ্চত দোষারোপ করবে। সুতরাং আমরা চাই আমাদের দেশের অবলা সহজ-সরল নারীদের নিয়ে অবৈধ নগ্ন বানিজ্য খেলা বন্ধ হোক। প্রতিষ্ঠা করি সকল মা-বোনের প্রাপ্য, ন্যায্য ও মৌলিক অধিকার। যে অধিকার ও সংষ্কৃতি নারীদের ইহকাল -পরকাল উভয়কালে কল্যাণ নিহিত আছে।
ডা. সৈয়দ আবদুর রহমান
প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী ,ঈদগাঁও, কক্সবাজার

0 Comments