Advertisement

অবুঝ মেঘের কাছে মাটি যখন ডার্টি!

ও কেঁদে উঠে বললো, ‘মামা, আলম আমার চকলেট নিয়ে গেল।’ মামা বললেন, ‘না বাবা, আমি আলমের কাছ থেকে নিয়ে আবার তোকে দিয়ে দেব।’ ও বললো, ‘সত্যি’? কান্না ভেজা গলায় মামা উত্তর দিলেন, ‘হ্যারে বাবা, সত্যি।’ কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে মামাকে প্রশ্ন করে ও বললো, ‘মামা, খুব শীত। এতো রাতে আমরা এখানে কি করছি?’ চাপা কান্নাটুকু আর ধরে রাখতে পারলেন না মামা। শক্ত হাতে আদরের ভাগ্নেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘বাবা, তোর আম্মুকে মাটি দিতে হবে’। নাক সিটকে ও বলে ওঠলো, ‘ছি!, একটু আগে একবার আব্বুকে মাটি দিলাম। আবার আম্মুকে মাটি দেবো! আম্মু বলেছে, মাটি ডার্টি (নোংরা)। হাতে ময়লা লাগলে আম্মু বকবে।’ ওপরের কথোপকথনের ‘ও’ নামক মূল চরিত্রটি আমাদের প্রায় সাত বছরের ছোট্ট অবুঝ শিশু মিহির সারওয়ার মেঘ। শনিবার হারিয়ে যাওয়া
আমাদের প্রিয় সহকর্মী, আমাদের প্রিয় বন্ধু আর অসংখ্য ছোটভাই সাংবাদিকদের শ্রদ্ধাভাজন বড় ভাই-বড় আপু সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি দম্পতির একমাত্র শিশুপুত্র এই মেঘ। আর ঘটনাস্থল রাজধানীর আজিমপুর পুরোনো কবরস্থান, সময় শনিবার রাত পৌনে নয়টা থেকে সোয়া নয়টা। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন আর
অসংখ্য সহকর্মীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শেষ বিদায় নিচ্ছেন সাগর-রুনি দম্পতি। আর সেখানে মেঘ উপস্থিত ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী বাবা-মায়ের কবরে একমুঠো মাটি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। এই সেই মেঘ, যে ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী। এই সেই মেঘ, যে ঘটনা শেষে তার প্রিয় নানুমনিকে সেলফোনে ফোন দিয়ে বলেছে, ‘আপু জানো, আমার বাবা-মা মারা গেছে।’ এরপরই জেগে উঠলেন সংবাদমাধ্যম কর্মীরা। জেগে উঠলো শহর, এরপর সারাদেশ। বুক ভাঙ্গা কান্না, চাপা আর্তনাদ সেই সঙ্গে চলছে তীব্র নিন্দার বাক্যবাণ, কখনো কখনো অনেকে ফুঁসে উঠছেন ক্ষোভে। এ এমন এক ক্ষোভ যেখান থেকে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘সম্মানিত(!) অফিসার, কিছুদিন আগে আপনি অত্যন্ত দম্ভভরে এবং গর্বের সঙ্গে দেশের একটি বহুল পরিচিত টিভি চ্যানেলের টক শো তে বলেছিলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মেক্সিকোর চেয়ে উন্নত এবং ভালো। প্রতিভাবান এই সাংবাদিক দম্পতির এমন নৃশংস মৃত্যুর পরেও কি আপনি বলবেন, দেশের পরিস্থিতি মেক্সিকোর চেয়ে ভালো?’ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা দু’সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়ে গুলিয়ে ফেললেন উত্তর। তারপর ফেরত দিলেন সেই পুরোনো উত্তর এবং বলাবাহুল্য যে উত্তরটি প্রশ্নের ধারে কাছে দিয়েও গেল না, ‘আমরা তদন্তের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছি। এ মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না। অনেকগুলো টিম এ ব্যাপারটি নিয়ে কাজ করছে। আমরা সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেখানে উপস্থিত অনেকে বলেই ফেললেন, ‘হায়রে অফিসার!’ এরপর ওই কর্মকর্তার তড়িঘড়ি স্থান ত্যাগ। কারণ, বিকেলেই তিনিসহ তার ডিপার্টমেন্ট’র অন্যান্য কর্তা ব্যক্তিদের যে পূর্ব প্রস্তুতি আছে রঙিন পর্দার চরিত্রদের সঙ্গে বৈকালিক বিনোদনের (?) শিডিউল। শুরু হয়েছিল শিশু মেঘের কথা দিয়ে। সাগর-রুনি দম্পতি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই রুনি পরিবারের পক্ষ থেকে মেঘকে সরিয়ে নেওয়া হয় তার খালার বাসায় নিরাপদ দূরত্বে। ভোরবেলায় মেঘ শেষবারের মতো দেখে নিয়েছে, রক্তমাখা তার বাবা-মাকে। ওই তার শেষ দেখা। এরপর সারাদিন শেষে আবার মেঘ উপস্থিত রাতে আজিমপুর কবরস্থানে। আলম নামে এক আত্মীয়ের কোলে মেঘ। দুই হাতে তার দুটি সাফারি চকলেট। অবুঝ মেঘের আবদার মেটাতেন যে বাবা-মা, অশ্র“ভেজা চোখে হƒদয়ের অকৃত্রিম ভালোবাসায় আত্মীয়ের মাঝেই কোনো একজন হয়তো সেই আবদার মিটিয়েছেন। কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসনের ব্যাপারতো পালন করতে হবে। কিন্তু অবুঝ মেঘ আলমকে বলে ওঠে, ‘চলো, এখানে খুব ঠাণ্ডা লাগছে। আর কতক্ষণ এখানে থাকবো।” বাবার কবরে মাটি দেওয়ার জন্য যখন মেঘের ডাক পড়ে, তখন মেঘ বলে ওঠে, ‘না, আমি যাবো না’। আর সবশেষে মায়ের কবরে মাটি দেওয়ার সময় মেঘ বলে, ‘আম্মু বলেছে মাটি ডার্টি (নোংরা)। হাতে ময়লা লাগলে আম্মু বকবে।’ বৈশাখ মাসের কালবৈশাখী ঝড়ের সময়কার অথবা বর্ষা-শরৎ কালের আকাশের বড় বড় মেঘ নয়, এই হচ্ছে আমাদের সাগর-রুনি দম্পতির ভালোবাসার নিদর্শন, এক টুকরো ছোট্ট অবুঝ মেঘ। বাংলানিউজ

Post a Comment

0 Comments