ঢাকা অফিস
টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে শুক্রবার (১৩ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমার প্রথম দফা। বাদ ফজর পাকিস্তানের হাজি আব্দুল ওয়াহাবের আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এ বিশ্ব ইজতেমা। রোববার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ দফা। দ্বিতীয় দিন শনিবার সকাল থেকে ধারাবাহিক জিকির ও বয়ানের মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের এই বিশ্ব সম্মেলনের কার্যক্রম চলছে।
সকাল থেকে ধারাবাহিক জিকির ও বয়ানের মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের এই বিশ্ব সম্মেলনের কার্যক্রম চলছে। শনিবার ফজরের নামাজের পর মুসলিস্নদের উদ্দেশে বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা
মো. এহসান। জোহরের পর বাংলাদেশের মাওলানা নুরুল হক, আসরের পর ভারতের জোবায়েরুল হাসান বয়ান ফরমায়েছেন এবং বাদ মাগরিব ভারতের আহম্মেদ লাট বয়ান করবেন বলে জানা গেছে।
মো. এহসান। জোহরের পর বাংলাদেশের মাওলানা নুরুল হক, আসরের পর ভারতের জোবায়েরুল হাসান বয়ান ফরমায়েছেন এবং বাদ মাগরিব ভারতের আহম্মেদ লাট বয়ান করবেন বলে জানা গেছে।
রোবাবার ইজতেমা মাঠের বিদেশি নিবাসের পূর্বপাশে মঞ্চ থেকে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১টার মধ্যে শুরু হবে আখেরি মোনাজাত। এর আগে হবে হেদায়তি বয়ান। হেদায়তি বয়ান করবেন ভারতের মাওলানা সাদ এবং দোয়া পরিচালনা করবেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের মুরবি্ব মাওলানা জোবায়েরুল হাসান। এ বছরও তাবলিগের মুরবি্বরা রেডিও-টিভিতে আখেরি মোনাজাত সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি দেননি।
চারদিন বিরতি দিয়ে ২০ জানুয়ারি শুরু হবে ইজতেমার দ্বিতীয় দফা। ২২ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বিশ্ব তাবলিগ জামাতের বার্ষিক এই সম্মিলন। ইজতেমা উপলৰে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ইজতেমা ময়দান পরিদর্শন করে নিরাপত্তার বন্দোবস্তের খবর নিয়েছেন। মুসলিম জাহানের শান্তি কামনা করে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। ১৭ হাজার বিদেশি মুসলিস্ন ইজতেমার প্রথম পর্বের প্রথম দিন মিসর, ওমান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, কানাডা, কম্বোডিয়া, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ইরান, জাপান, মাদাগাস্কার, মালি, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, পানামা, সেনাগাল, দৰিণ আফ্রিকা, তাঞ্জানিয়া, ত্রিনিদাদ, রাশিয়া, আমেরিকা, জিম্বাবোয়ে, বেলজিয়াম, ক্যামেরুন, চীন, কমোরেস, ফিজি, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, সুইডেন, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, জাম্বিয়া, কোরিয়া, আলজেরিয়া, জিবুতি, ইথিওপিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, কুয়েত, মরক্কো, কাতার, সোমালিয়া, সিরিয়া, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, পাকিস্তান, বাহরাইন, ইরিত্রিয়া, জর্ডান, মৌরিতানিয়া, ভারত, সুদান, দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রায় ১৭ হাজার মুসলিস্ন ইজতেমায় অংশ নিয়েছেন।
ইতোমধ্যে কনকনে শীত ও কুয়াশা উপেৰা করে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান ইজতেমা মাঠে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তারা জেলাওয়ারি মাঠের ৩৯টি খিত্তায় অবস্থান করছেন। প্রথম দিন শুক্রবারের জুমার নামাজে অংশ নিতে ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জসহ টঙ্গীর আশপাশের লৰাধিক মানুষ বিভিন্ন যানবাহনে করে ইজতেমাস্থলে এসে সমবেত হয়েছেন। মুসলিস্নদের আলস্নাহু আকবার জিকিরে ইজতেমাস্থলে এখন ধর্মীয় পরিবেশ বিরাজ করছে।এবারের বিশ্ব ইজতেমা উপলৰে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইজতেমাস্থলে সার্বৰণিক পানি ও বিদু্যৎ সরবরাহের লৰ্যে ওয়াপদা, ওয়াসা ও বিদু্যৎ কর্তৃপৰ বেশ কয়েকটি জেনারেটর স্থাপন করেছে। ইজতেমা চলাকালে মুসলিস্নদের অজু, গোসল, রান্নাবান্না, টয়লেটের কাজের জন্য পর্যাপ্ত পাম্পের মাধ্যমে সার্বৰণিক পানি সরবরাহের পাশাপাশি ট্যাঙ্কার ও ট্রলির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ খাবার পানির সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্যান্ডেল এবং এর আশপাশে রয়েছে বেশ কিছু গভীর ও অগভীর নলকূপ। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বেশ সুউচ্চ কটি পর্যবেৰণ টাওয়ার বসানো হয়েছে। র্যাব সদস্যরা ওইসব টাওয়ার থেকে ইজতেমাস্থল পর্যবেৰণ করছে। আকাশে হেলিকপ্টারে ও তুরাগ নদীতে স্পিড বোটের টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া মুসলিস্নবেশে গোয়েন্দা পুলিশ মাঠে ও খিত্তার মুসলিস্নদের মাঝে অবস্থান করছে। মাঠের প্রবেশপথে ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ, র্যাব ও সাদা পোশাকধারী পুলিশসহ গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা কড়া নজরদারি করছে। প্রতিটি গেট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরা বসানো হয়েছে। মাঠে প্রবেশকালেও মুসলিস্নদের (সন্দেহভাজনদের) মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তলস্নাশি চালানো হচ্ছে।
যৌতুকবিহীন বিয়ে অনুষ্ঠিত: বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় দিনে ইজতেমার মাঠ এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। শনিবারও বাস, ট্রাক, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন পরিবহনে হাজার হাজার মানুষ টঙ্গীতে এসেছেন ইজতেমায় যোগ দিতে। রোববার আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত টঙ্গী অভিমুখে মানুষের এই ঢল চলবে।
শনিবার আসরের নামাজের আগে যৌতুকবিহীন বিয়ের আসরে ১১০টি যৌতুকবিহীন বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাবলিগের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরেও ইজতেমা মাঠে যৌতুকবিহীন বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। এবার বিয়ে পড়িয়েছেন ভারতের মাওলানা জোবায়েরুল হাসান। এ জন্য শনিবার সকাল থেকেই অভিভাবকরা পাত্র-পাত্রীদের নাম তালিকাভুক্ত করেন। কনের সম্মতিতে বর ও উভয় পৰের লোকজনের উপস্থিতিতে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে, বয়ান মঞ্চ থেকে মোনাজাতের মাধ্যমে নবদম্পতিদের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া পড়া হয়েছে। মঞ্চের আশপাশে মুসলিস্নদের মধ্যে খোরমা-খেঁজুর বিতরণ করা হয়েছে।
ইজতেমার ১১ মুসলিস্নর মৃতু্য: বিশ্ব ইজতেমায় এসে শুক্রবার রাতে এবং শনিবার ৩ মুসলিস্ন মারা গেছেন। তারা হলেন বরিশাল জেলার আব্দুল মজিদ (৬০) তিনি শুক্রবার রাতে ইজতেমার মাঠে মারা যান। কুষ্টিয়া জেলার আলিমুজ্জামান (৫৫) ও সামসুল হক (৬০) এরা শনিবার সকালে ইজতেমা মাঠে মারা গেছেন। তাদের জানাজার নামাজ শনিবার বাদ ফজর ও বাদ জোহর ইজতেমা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে বুধবার, বৃহস্পতি ও শুক্রবার টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে এসে আরো ৮ মুসলিস্নর মৃতু্য হয়েছে। এরা হলেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার কাগবাড়িয়া গ্রামের মো. নজিবুলস্নাহ (৬০), একই জেলার ফটিকছড়ি থানার ধর্মপুর গ্রামের মাহবুদ (৭০), হবিগঞ্জ জেলার মৃত মোতালেব খানের পুত্র মো. গফুর খান (৫৫), সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানার মামুদ গ্রামের হাবিবুর রহমান (৭০), ফেনীর মৃত আব্দুর রাজ্জাকের পুত্র মো. মোস্তফা (৬০), শেরপুর জেলার মো. শহিদুলস্নাহ (৬০), নরসিংদীর রায়পুরা থানার বালুয়াকান্দি গ্রামের আ. জলিল (৫৫) এবং কুষ্টিয়া জেলার আলিম উদ্দিন (৬৫), সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানার মামুদ গ্রামের হাবিবুর রহমান (৭০), চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার কাগরিয়া গ্রামের নজীব উল্যাহ (৬০) ও ফেনীর মো. মোস্তফা (৬০), মাদারীপুরের রতন সরকার (৫০), হবিগঞ্জের আব্দুল গফুর খান (৫৫) ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার বাহমাদ্দি গ্রামের আলিম উদ্দিন সরকার (৭০) ও চট্টগ্রামের মাহবুদ (৭০)। নরসিংদীর রায়পুরা থানার বালুয়া কান্দি গ্রামের আ. জলিল (৫৫) মারা গেছেন। শুক্রবার বাদ ফজর ও বাদ জুমা তাদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার মঞ্চ: প্রথম দফা বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে অংশ নেবেন রাষ্ট্রপতি মো. জিলস্নুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মোনাজাতে মূল মঞ্চে থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. জিলস্নুর রহমান, বাটা সু- কোম্পানীর অভ্যন্তরে একটি বিশেষ মঞ্চে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, এটলাস বাংলাদেশ লি.-এর ছাদে নির্মিত মঞ্চে অবস্থান করে মোনাজাতে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। ২২ জন হকার আটক: শনিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত টঙ্গী থানা পুলিশ ইজতেমাস্থল ও আশপাশে এলাকা থেকে ২২ জন হকারকে আটক করেছে। তাদের টঙ্গী থানায় রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে আটক হারুনুর রশিদ (৩৬) নামে এক ব্যক্তিকে জঙ্গি সন্দেহে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ সুপার আ. বাতেন জানান। তার বাড়ি ঢাকার লালবাগ এলাকায় শনিবার যারা বয়ান করলেন: নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযাীয় শনিবার বাদ ফজর থেকে সাধারণ মুসলিস্নদের উদ্দেশে বয়ান শুরু করেন পাকিস্তানের মাওলানা মো. এহসান, পরে বাদ জোহর বাংলাদেশের মাওলানা নুরুল হক, বাদ আসর ভারতের জোবায়েরুল হাসান এবং বাদ মাগরিব বয়ান করেছেন ভারতের আহম্মেদ লাট । রোববার বেলা ১২টা থেকে ১ ঘটিকার যে কোনো সময় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন ভারতের মাওলানা জোবায়ের হাসান।যা বয়ান করলেন: দুনিয়ার জিন্দেগি ৰণস্থায়ী, আলস্নাহর কাছে আমল ছাড়া এ দুনিয়ার জিন্দেগির কোনো মূল্য নেই। বয়ানে আরো বলা হয়, দীনের দাওয়াতের মাধ্যমে ঈমান মজবুত হয়। ঈমান মজবুত হলে আলস্নাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর এ সম্পর্ক গড়ে ওঠলে দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াবি হাসিল হয়। দাওয়াতি কাজে জানমাল খরচ করলে আলস্নাহ তা আরো বাড়িয়ে দেন। মহিলাদের ভিড়: বিশ্ব ইজতেমায় মহিলাদের অংশগ্রহণ ও অবস্থানের কোন সুযোগ নেই। ইজতেমাস্থলে আসার ব্যাপারে আয়োজক কতর্ৃপৰের নিষেধ রয়েছে। তারপরও ইজতেমার বয়ান শুনতে ও আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে ইজতেমা মাঠের বাইরে স্থানে স্থানে বিভিন্ন জেলা ও স্থান থেকে এসে মহিলাদের অবস্থান নিতে দেখা গেছে। নোয়াখালী থেকে গৃহবধূ সালমা বেগম জানান, তিনি ও তার দুই পুত্রবধূকে নিয়ে টঙ্গীর নিকট আত্মীয়ের বাসায় ওঠেছি। হজে যেতে না পারলেও হজের পর মুসলমানদের এ বৃহত্তম জামাতে আসতে ও ধর্মের মূল্যবান বয়ান শুনতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। হাসপাতালে ভর্তি: টঙ্গী হাসপাতালে শনিবার বিকেল ২টা পর্যন্ত মোট ১৫ জন মুসলিস্ন চিকিৎসা নিয়েছেন। অ্যাজমা ও পেটেরপীড়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ১২ জন মুসলিস্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কর্মরত আবাসিক চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন সিরাজী। এছাড়াও ইজতেমাস্থল এলাকায় বিনামূল্যে চিকিৎসাকেন্দ্রে কয়েক হাজার মুসলিস্ন চিকিৎসা নিয়েছেন।


0 Comments