Advertisement

আমরা কি ভুল করেছিলাম?

ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে এ কি হয়ে গেল! সর্বমহলে জানে না এমন কেউ নেই ইউনিপে টু ইউ কি। এই কোম্পানিটি বহুল আলোচিত এবং এখন সমালোচিত। এই কোম্পানিটি সরকারের অনুমোদন নিয়ে প্রকাশ্যে অনলাইন ও ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। জাতীয় দৈনিক থেকে শুরু করে প্রতিটি এলাকার স্থানীয় ছোট পত্রিকাগুলো পর্যন্ত তাদের হায় হায় কোম্পানি বলে রিপোর্ট লিখেছিল। প্রথম সারির পত্রিকায় প্রথম পাতায় অনেক বড় হেড লাইন দিয়ে অনেকবার দেশের মানুষকে চমকে দিয়েছিল। কিভাবে সম্ভব লাখে দ্বিগুন টাকা দেওয়া। অনেকেই পজিটিভ আর নেগেটিভ বিশ্বাস নিয়ে ইনভেষ্ট করেছেন
 এবং এড়িয়ে গেছেন। আমরা জানি প্রথম সারির পত্রিকায় যদি কোন রিপোর্ট আসে তাহলে সরকার তার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। এবং সুনির্দিষ্ট কারণ উদ্ঘাটন করে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু দেখা গেল কোম্পানিটির বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোন ব্যবস্থা তো নেয়নি বরং অদৃশ্যভাবে সাপোর্ট দিচ্ছিল যা সব্ইা বুঝতে পারছিল, কোম্পানিটি যেহেতু বন্ধ হচ্ছে না বা বন্ধ করছে না ফলে মানুষের মনে একটা বিশ্বাস জম্নেছিল যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সরকার নিশ্চয় ভাল কোন উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে দিয়ে বুক ফুলিয়ে নিজেরা ভূয়া কোম্পানি নয় বলে মানুষের সামনে লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে জাহির করল। কোম্পানিটির ঘুষ দিয়ে আদায় করা অনুমতিপত্রগুলোর খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে বন্ধ করতে পারছে না বলে প্রচাার হল আইনি জটিলতার কারণ দেখিয়ে। এরই মধ্যে কোম্পানিটি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা দ্বিগুনের লোভ দেখিয়ে হাতিয়ে নিল। এতবেশি পরিমাণ ইনভেষ্ট হলো যে ব্যাংকে পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন করতে হিমসিম খেতে হয়েছে। যা সবার জানা কথা। মানুষজন ব্যাংক থেকে তাদের আমানত তুলে ও ফিক্সডেপোজিটের টাকা ভেঙ্গে ইনভেষ্ট করল। পত্র-পত্রিকাগুলো একদিন পক্ষে লিখছেন তো আরেকদিন বিপক্ষে এভাবে চলতে চলতে একদিন কিছু পত্রিকায় ঘোষণা আসল যে এ সমস্ত কোম্পানির সাথে লেনদেন করা যাবে না, করলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। তারপরও কিছুদিন চলল কোম্পানি নামক কোম্পানির দালালদের গুজবে। শেষতক প্রথম আলোয় লাল করে হেড লাইন আসল যে ইউনিপে’র টাকা ফেরৎ পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই। এই সংবাদের পর থেকে মানুষ আসল বুঝতে পারল। সবার দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল যার যার আপ লাইন বা লীডারদের ধরার জন্য। তারা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করছে বিভিন্ন আজগুবি কথা বলে। আগামী কাল, পরশু, তরশু, অমুক তারিখ, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে, আদালতে মামলা হবে এই-সেই ইত্যাদি সমাচার। মানুষ এখনও আশা করছে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু টাকা ফেরত পাওয়ার। কেনইবা করবে না, যে মানুষটি ব্যাাংক লোন করে, পেনশনের টাকা, সম্পদ বিক্রির টাকা, গরু-ছাগল বিক্রির টাকা এই প্রতারক কোম্পানিটির হাতে তুলে দিয়েছে শুধুমাত্র দ্বিগুন টাকার লোভে। অনেকেই দিয়েছে দৈনন্দিন ব্যয় আর বর্তমান আয় দিয়ে যাপিত জীবন যাপন করতে পারছে না বলে। এই কোম্পানিতে কি শুধু মাত্র অবুঝরাই টাকা ইনভেষ্ট করেছে? দেশের অনেক পদস্থ অবসরপ্রাপ্ত বা বর্তমান কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তা, চাকুরিজীবী, ব্যবসায়ী, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সহ অনেক দরিদ্রশ্রেণীর লোকেরা পর্যন্ত প্রকাশ্যে বা গোপনে টাকা ইনভেষ্ট করেছে। আজ অনেকেই লজ্জিত ও অপমানিত। কাউকে বলতেও পারছেন না আবার বড় গলায় চাইতেও পারছেন না। প্রেস্টিজ ইস্যু নিরবে নিভৃতে তাকে অন্ত:ক্ষরণ করছে। নিজেই বলতে পারছেন না কেন দিয়েছি এত টাকা, এখন কি হবে, কোথায় পাব, কে দেবে? আজকের দিনে এগুলোই যেন বিনিয়োগকারীদের অন্তরের অন্ত:স্থলের কথা। যেন কিছুই করার নেই তাদের, নির্বাক হয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে কখন তার মুল টাকা হলেও সে ফেরত পাবে। এমন অনেক কাহিনী আছে যা রূপকথাকেও হার মানাবে। এগুলো ডকুমেন্টারী আকারে প্রকাশ করা হলে মানুষ হতবাক হবে। দেশে এটা কি হয়ে গেলো!
সচেতন মানুষগুলো প্রথম দিকে কিন্তু ইনভেষ্ট করেনি। আমি নিজেও প্রথম প্রথম ইনভেষ্ট করিনি। কেন করেছি এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব আমাদের একটি বৈধ সরকার আছে যারা আমাদের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। দেশের নাগরিকের নিরাপত্তা, সব মানুষের নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ করার দায়িত্ব একমাত্র সরকারের। দেশের জাতীয় কোন সমস্যা দেখা দিলে তার দায়ভার সরকারকেই নিতে হয়-হবে। এই ঘটনাটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি কৃত্রিম দুর্যোগ। সরকারের কিছু উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও নামধারী স্বর্ণব্যবসায়ী দালালরা মিলে নিজেদের স্বার্থে অনলাইনে ভার্চুয়াল গোল্ড গেম অর্থাৎ কাল্পনিক স্বর্ণ দিয়ে গেম শো’টি খেলেছে সাধারণ মানুষদের টাকা কে মোটা অংকের আয়ের উপকরণ বানিয়ে। সবচেয়ে সত্য কথা হলো সবাই জানে যে আসলে কারা এটা করেছে। এই কোম্পানির অস্বাভাবিক লেনদেন এর কারণে বৃহদায়তন শিল্প কারখানা গড়ে উঠার উপায় শেয়ার বাজারের মৃতপ্রায় অবস্থা।
ভূয়া কোম্পানিটি এতদিন চলল আবার হঠাৎ করে বন্ধ! তারা তো সকালে ইনভেষ্ট করলে বিকালে পাবেন জাতীয় কবিরাজদের ঔষধ বিক্রির বিজ্ঞাপনের মত বিজ্ঞাপন দেয়নি। একদিনে শুরু হয়ে একদিনে টাইম শেষ অথবা শুধুমাত্র একমাসের জন্য সুবর্ণ সুযোগ বিজ্ঞাপন দিয়ে কাজ করেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোক দিয়ে, দামী হোটেলে সম্মেলন করে, রাজধানী ঢাকায় ষ্ট্যান্ডার্ড অফিস নিয়ে, অনুমোদন দাতাদের অনুমোদন নিয়ে, জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা কার্যক্রম চালায়। যখন র‌্যাব বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে কিছু এজেন্ট ও লীডারকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করেছিল কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই লোকগুলি কোম্পানির বিভিন্œ প্রমাণপত্র দেখিয়ে আগের চেয়ে আরও বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে হরদম কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। এর পর থেকে র‌্যাব কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। একসময় যখন প্রতিটি দৈনিকে এত লেখালেখি হয়েছিল তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোথায় গিয়েছিল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে অনেক পত্রিকায় একপাতায় কোম্পানির বিজ্ঞাপন তো আরেক পাতায় হায় হায় কোম্পানি হিসেবে সমালোচনা। লেখালেখি হচ্ছে কিন্তু বন্ধ তো হচ্ছে না, কোনদিন বন্ধ হবে না দালালগুলোর এই সেদিনের কথা। সরকারের অনমনীয় ভাব দেখে সাধারণ মানুষের কাছে কোম্পানির দালালদের গুজবগুলো সত্যের মত মনে হলো।  আজ যেন মনে হচ্ছে কেউই কিছুই জানে না। সরকারের যে কর্তৃপক্ষ লেনদেন না করার আহবান করেছিল তারা আজ নিরব, যেন কিছুই জানেন না। কোন পত্রিকায়ও উল্লেখযোগ্য খবর প্রকাশিত হচ্ছে না। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও সরকারকে দায়ী করে নিজস্ব প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে না। ইদানিং কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন চ্যানেলে যা সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের ইন্দ্রিয়ের উদ্রেক হওয়ার মত নয়। সব জনগন তো আর মিডিয়ার মালিক নন। তাদের দাবী যখন তখন তুলে ধরবে। এভাবে মিডিয়াগুলোর উপরও মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। টাকায় কথা বলে মিডিয়াও এই যুক্তিতে বিশ্বাসী। তাহলে মিডিয়াগুলো কার স্বার্থের জন্য কাজ করে? নিজেদের প্রচার প্রসার ও সম্মানিত করার জন্যে? এতে করে মানুষ ও দেশের কি লাভ হবে। পরিবর্তন আনতে হলে প্রতিবাদ করতে হবে আর প্রতিবাদের ভাষা এক্সচেঞ্জ করার মাধ্যম হচ্ছে মিডিয়া।  টাকার জোরে আসলেই যে সব সম্ভব এটা আবারো ধ্রুব সত্য প্রমাণিত হলো। না হলে এতবড় ঘটনা হাজার হাজার মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা ইনভেষ্ট করে এখন পথে বসে গেছে অথচ মানুষ এখনও জানে না তার টাকা সে আদৌ ফেরত পাবে কিনা। আমরা কোন দেশে বাস করছি. মনে হয় এটা সোমালিয়ার চেয়ে আরও খারাপ রাষ্ট্র। সেখানে এত গন্ডগোল উপযুক্ত সরকার ব্যবস্থা না থাকার কারণে আর আমাদের দেশে তো সরকার আছে তারপরও কিভাবে এই ডিজিটাল বাটপারি করল। আমরা কি আসলে কোনদিন সভ্য হতে পারব না ? আদর্শবোধ বলতে কি আমাদের কিছুই নেই? টাকার জন্য কি আমারা সবকিছ্ইু বিকিয়ে দিতে পারি? মানুষ যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তখন থানা বা আদালতের আশ্রয় নেয়। দেখা যাচ্ছে যে মানুষ ওখানেও নিরাপদ নয়। এভাবে যদি একটা দেশ চলে তাহলে শেষ আশ্রয়ের জন্য মানুষ কার কাছে যাবে। যেন নিয়তিই একমাত্র ভরসা।  
সরকার সম্পর্কে মানুষ কি মনে করছে এখন? সরকার যদি বন্ধ করে দিত তাহলে তা প্রথমে দেয়নি কেন? এতদিন পর এসে কেন বন্ধ করে দিল। এতগুলো মানুষের ইনভেষ্টকৃত টাকার দায়ভার কে নেভে? এখনও মনে হচ্ছে সরকারের কেউ কিছুই জানেন না, যেন জেনেও না জানার ভান করছেন। এভাবে এরা আর কত  মানুষ কে কাঁদাবে। সর্বস্ব করবে। আত্মহত্যায় বাধ্য করবে। সংসার ভাঙবে। এই এমএলএম নামধারী কোম্পানীগুলো এখনও বিভিন্নভাবে মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগ করলেও এ ব্যাপারে অভিভাবক হিসেবে কিন্তু সরকার তার বিরদ্ধে যথেষ্ট আন্তরিক নন। মনে হয় যেন নিয়ন্ত্রক বলতে কেউ নেই। যার যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। শুধু টাকার দরকার। নীতি বলতে কিছু নেই। টাকাই সব। এই কথা ব্যক্তি পর্যায়ে সত্য হলেও রাষ্ট্র এই বিশ্বাস জনগনকে সৃষ্টি করাতে পারে না। রাষ্ট্রীয় যেই নিয়ম কানুন আছে তার মধ্যে জনগনের অধিকার ও নিরাপত্তার ব্যাপারে রাষ্ট্র সবসময় সচেতন। নিয়মগুলো লিপিবদ্ধ আছে ঠিকই পুরোপুরি প্রয়োগ আছে বলে মনে হয় না। আর তা না হলে একটা জাতীয় অন্যায়ের বিচার কেন এত পেন্ডিং অবস্থায় থাকবে? 
সরকারের ্উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নামধারী কোম্পানিটির আইডিতে যারা এজেন্ট হিসেবে এবং লীডার হিসেবে কাজ করেছে তাদের নাম ঠিকানার তালিকা করে কার মাধ্যমে কত টাকা ইনভেষ্ট হয়েছে, কে কত টাকা স্পট ইনকাম, মেচিং ইনকাম এবং ইনভেষ্টররা কত কিস্তি পেয়েছে তার হিসাব করে গ্রাহকদের টাকার একটি অংক ফেরত দেওয়া অবশ্যই সম্ভব। তাদের পাকড়াও করে বা নোটিশ দিয়ে টাকা ফেরতে বাধ্য করা সম্ভব। কারণ তারা ভিনদেশী কেউ নন। আমাদের আশে পাশেই তারা অবস্থান করছে। সংবাদ সম্মেলন, মানব বন্ধন, স্বার্থ রক্ষা কমিটি, আন্দোলন কিছুই করতে পারবে না যদি সরকার না চায়। আর সরকার যদি চায় যখন তখন ব্যবস্থা নিতে পারে এবং হবে। এক টাকার লাল পয়সা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অন্যথায় কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেও এত টাকা ফেরত দেওয়া কোনদিন সম্ভব হবে না। কারণ কোম্পানিটি কোন Ÿ্যবসা করেনি, যতসামান্য করেছে তা আই ওয়াশ ছাড়া আর কিছ্ইু ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ১০ মাসের সার্কেলে মাসিক কিস্তিতে প্রতিনিয়ত প্রচুর নতুন গ্রাহকদের অন্তর্ভূক্তিতে পূর্বের গ্রাহকদের ইনভেষ্ট দ্বিগুন দেওয়ার ফাঁদের নেটওয়ার্ক গড়ে অর্থ আত্মসাত করা। তারা সফলও হয়েছে। ্এতকিছুর পরও মানুষ আশা করছে সরকারের প্রধানমন্ত্রী সহ একটি প্রভাবশালী মহল বিষয়টি বুঝতে পেরেছে এবং ভুক্তভোগীরা আশা করছে শেষ পর্যন্ত একটা কিছু করবে।

Post a Comment

0 Comments