Advertisement

গত ৩১মাসে সারাদেশে ৩৯৬ জনের মৃত্যু:বাড়ছে পুলিশি হয়রানি....

সোহরাব হোসেন চৌধুরী :
পুলিশকেই এখন দেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। গত ৩১ মাসে সারা দেশে গণপিটুনির শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৯৬ ব্যক্তি। এর মধ্যে গত ৭ মাসেই গণপিটুনিতে মারা গেছেন ৯৫ জন। সে হিসাবে প্রতি মাসে গণপিটুনিতে মৃত্যু ঘটেছে কমবেশি ১৩ জনের। দেশে গণপিটুনির ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অবনতির ছায়া ফেলেছে। গণপিটুনির বাইরে পুলিশের অমানবিক আচরণ, কার্যক্রম, দলীয়করণের ফলে দেখা দিয়েছে সাধারণ মানুষ এ বাহিনীর ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। আর পুলিশ বাহিনীর ইমেজ সংকটের মাধ্যমে গোটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে বিশিষ্টজনদের অভিমত। সাধারণ জনগনের  অভিযোগ, পুলিশ প্রতিদিন জেলার পথঘাটে মানুষকে নানাভাবে হয়রানির মাধ্যমে কলুষিত করছে আইন, জাতি তথা দেশকে। কিছুদিন পর পরই নতুন করে আলোচনায় আসেছে পুলিশ আর পুলিশি নির্যাতন। কয়েকদিন পর পরই পত্রিকার পাতায় তাকালেই চোখে পড়ে পুলিশি নির্যাতনের নানা অভিযোগ। পুলিশকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে নেয়ার কথা থাকলেও সে পুলিশকেই সাধারণ জনগণ ভয় পাচ্ছেন। এদিকে দেশে গণপিটুনিতে নিহতের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে একটি স্বার্থানে¦ষী মহল তাদের সুবিধা আদায় করতে গণপিটুনিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। রয়েছে গণপিটুনির সময় কর্তব্যরত পুলিশের গাফিলতিরও অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের সামনে অথবা পুলিশের সহযোগিতায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় থানায় মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনাতেই যথাযথ তদন্ত করেনি পুলিশ। মূলত দায়সারার জন্য তদন্ত হয়। ফলে নিহতদের পরিবার হত্যাকান্ডের সঠিক বিচার পাচ্ছে না। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে আসামিরা। এছাড়া কোনো কোনো ঘটনায় গণগ্রেপ্তারের নামে পুলিশি বাণিজ্যের অভিযোগও আছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রিপোর্ট মতে, গত ৩১ মাসে দেশে ৩৯৬ ব্যক্তি গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১২৭ জন এবং ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৪ জনে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে গত ৭ মাসেই দেশে গণপিটুনিতে ৯৫ জন নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায় বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে ডাকাতির অভিযোগে। গত ১৭ জুলাই শবেবরাতের রাতে ঢাকার আমিনবাজারে ৬ ছাত্রকে ডাকাত আখ্যা দিয়ে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। গণপিটুনির সময় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে খবর দেয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে গণপিটুনিতে আরো উৎসাহ দেয়। এছাড়া গণপিটুনিতে বেঁচে যাওয়া এক যুবককে ডাকাত বানানোর নাটক সাজায় পুলিশ। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আল-আমিন বলেছেন, পুলিশের সামনে তাকে পিটুনি দেয়া হয়েছে। বাঁচার জন্য আল-আমিন পুলিশের পায়েও ধরেছিল। পুলিশের এক কর্মকর্তা আল-আমিনকে ডাকাতি করতে সেখানে গিয়েছিল এমন স্বীকারোক্তি দিলে তাকে বাঁচানোর শর্ত দেয়। আল-আমিন রাজি হলে থানায় নিয়ে হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে তাকে ডাকাতি মামলার আসামি করে পুলিশ। গত ২৬ এপ্রিল কক্সবাজারের রামুতে গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে ১০ ডাকাত নিহত হয়। গত বছরের ৬ নভেম্বর রাতে রাজধানীর শ্যামপুর-কদমতলীর এলাকার বাসিন্দারা ডাকাত সন্দেহে ৫ জনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল তারা ডাকাত ছিল না। ডাকাত আখ্যা দিয়ে তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় মামলা হলেও পুলিশ তদন্ত করে কারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তা উদঘাটন করেনি। এছাড়া একই বছর গত ১৮ নবেম্বর রাতে হারিয়ে যাওয়া ট্রাক খুঁজতে গিয়ে কেরানীগঞ্জে গণপিটুনিতে নিহত হন রাজধানীর দক্ষিণখানের ১ যুবক। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ ছিল, যারা ট্রাক চুরি করেছে তারাই গণপিটুনি দিয়ে ট্রাক মালিকের লোকজনকে হত্যা করেছে। দিনের পর দিন এভাবে মানুষ গণপিটুনির শিকার হলেও মিলনের ঘটনা ছাড়া অন্য কোনো গণপিটুনিতে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা বা পুলিশের মদদদানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং পুলিশ বিভিন্ন গণপিটুনির ঘটনায় দায়ের করা মামলা তদন্তকালে কারা ঘটনা ঘটিয়েছে, কেন ঘটিয়েছে তার প্রকৃত কারণ উদঘাটন না করে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের তদবিরে বা আর্থিক কারণে অপরাধীদের রক্ষায় একটি দায়সারা প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। ঢাকার আমিনবাজারে ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার সঙ্গে মদদ ছিল স্থানীয় পুলিশের। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পুলিশের অবহেলার কারণেই ৬ ছাত্রের নির্মম মৃত্যুর খবর চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পরিণত হয়। আমিনবাজারের রেশ না কাটতেই রাজধানীর খিলগাঁও থানা পুলিশ ভয়ানক এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ ছাত্র আব্দুল কাদেরকে বেআইনিভাবে ধরে পিটিয়ে গুরুত্বর আহত করে পুলিশ। এ ঘটনা মিডিয়ায় ও পত্র-পত্রিকায় আসার পর তোলপাড় শুরু হয়। দেশের উচ্চ আদালতে এ ঘটনার রেশ পড়ে। যার ফলে উচ্চ আদালতও বিহিত ব্যবস্থা নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। ঢাবি ছাত্র কাদেরের ঘটনা সামাল দেয়ার চেষ্টা চালায় পুলিশ। কিন্তু তারা দিতে পারেনি কোনো সদুত্তর। এর মাঝেই ঘটে যায় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন নিপীড়ন ও হত্যার মতো নারকীয় আরেকটি ঘটনা। নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জে পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদেই পিটিয়ে হত্যা করা হয় মিলনকে। এসব ঘটনা জনসমক্ষে উঠে আসায় তোলপাড় হয়। অনেক অজানা ঘটনাই আছে যেগুলো কোনোভাবেই সচেতনদের কান পর্যন্ত পেঁৗঁছায় না। সাম্প্রতিক কালের এসব ঘটনা নিয়ে পুলিশের দায়িত্ব সচেনতার অভাবই দেখা দেয় ইমেজ সংকট। এ ইমেজ সংকটের কবলে পড়ে পুলিশের ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধার কোনোভাবে সম্ভব কি না এমন চিন্তাভাবনা পুলিশের উচ্চমহলে। তাছাড়া অনেক মৃত্যু ঘটনা আছে যা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নি । পুলিশের সাবেক আইজিপি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ এস এম শাহজাহান বলেছেন, দ বিধির ৩০৪ ধারায় বলা আছে, কাউকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হলে তা খুন হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি হবে যাবজ্জীবন। তিনি আরো জানান, গণপিটুনি এক ধরনের সংক্রামক ব্যাধি। অপরাধীদের শাস্তি দেয়া না হলে এটা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়বে। একজন লোক খারাপ হলেও তাকে গণপিটুনি দিয়ে মারা যাবে না। এটা অসাংবিধানিক। যারা এ ধরনের কাজে সহায়তা করেন তারা হত্যাকাণ্ডের সহযোগী। পুলিশের দায়িত্ব হবে এসব কাজ প্রতিরোধ করা। কিন্তু প্রতিরোধমূলক কাজ না করে যারা প্রশ্রয় দেয়, ব্যর্থতার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া উচিত। র‌্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল শাখার পরিচালক কমান্ডার মোহাম্মদ সোহায়েল বলেন, গণপিটুনিতে কেউ নিহত হোকÑ এটা কারো কাম্য নয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় বা তাদের গাফিলতিতে গণপিটুনির যদি ঘটনা ঘটে। সে ক্ষেত্রে এটি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, জনগণ নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে গণপিটুনির ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর পুলিশও রেফার করছে গণপিটুনিতে। গণপিটুনি হলে পুলিশের কোনো দায় দায়িত্ব নেই। পুলিশ গণপিটুনিকে এক ধরনের আইনি বৈধতা দিচ্ছে।তাছাড়া এরমধ্যে পুলিশের অনেক সুনামের ভূমিকাও রয়েছে। উল্লেখ্য যে ,উপরোক্ত বিভিন্ন তথ্য বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে ।

Post a Comment

0 Comments