মুবারাক উদ্দিন নয়ন
চকরিয়ায় টানা ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে মাতামুহুরী নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে লোকালয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সামদ্রিক জোয়ারের পানি। এতে করে উপজেলার ১৮ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার প্রায় নীচু এলাকা প্লাবিত হয়ে অন্তত ২লাখ মানুষ গত কয়েকদিন ধরে পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চকরিয়া পেকুয়া মগনামা সড়ক, চিরিংগা ছিকলঘাট মানিকপুর সড়ক, ছিকলঘাট কৈয়ারবিল সড়ক, চিরিংগা কেবি জালাল উদ্দিন সড়ক, চিরিংগা বদরখালী মহেশখালী সড়কসহ উপজেলার প্রায় ১০টি সড়ক উপসড়ক। একাধিক সড়কের উপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো: আবছার উদ্দিন জানিয়েছেন, মাতামুহুরী নদীর বিপদসীমা স্মরণকালের রেকর্ড অতিক্রম করে ৬দশমিক ২৫মিটারের স্থলে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে ৭দশমিক ২০মিটার উপর দিয়ে ঢলের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে পাউবোর লামা মাতামুহুরী ব্রীজ পয়েন্টে একই সময়ে ১২দশমিক ৫৬মিটারের স্থলে ১৪দশমিক ০১মিটার উপর দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। পানি বেড়ে যাওয়ায় মাতামুহুরী নদীর পানির সাথে নদীর তীর এলাকার গ্রাম গুলো মিশে একাকার হয়ে গেছে। নদীতে অস্বাভাবিক পানি বেড়ে যাওয়ায় প্রবল স্রেুাতে উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী, বিএমচর, বরইতলী, পহরচাদা, চিরিংগা, ফাসিয়াখালী ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় পাউবোর একাধিক পয়েন্টে নতুন করে বেড়িবাধ ভেঙ্গে পড়েছে।
জানাগেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে অবিরাম বর্ষণে ও মাতামুহুরী নদীর উৎপত্তিস্থল আলীকদম পাহাড়ী এলাকা থেকে নেমে আসা পানি নদীতে বেড়েই চলছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে নদীতে। এ অবস্থায় গত বন্যায় উপজেলার বেশ কটি ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাধের অংশ দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে সামদ্রিক জোয়ার ও পাহাড়ী ঢলের পানি। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চকরিয়া শাখা কর্মকর্তা আবদুচ ছাত্তার জানিয়েছেন, ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় মাতামুহুরী নদীতে পানি বেড়েই চলছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপজেলার সুরাজপুর মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক জানিয়েছেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে তার ইউনিয়নে ১হাজার একর খিরা ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধির কারণে ছিকলঘাট মানিকপুর সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার শতশত পরিবার পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলাসহ ফসলী জমি। পানিতে ভেসে গেছে ৩টি গরু। বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান এটিএম জিয়া উদ্দিন চৌধূরী জানিয়েছেন, গত বারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পাউবোর বেড়িবাধ দিয়ে পহরচাঁদা বিবিরখিল এলাকায় হুহু করে ঢুকছে মাতামুহুরী নদীর ঢলের পানি। এতে তার ইউনিয়ন প্রায় এলাকা কোমর পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এদিকে উপজেলার লক্ষ্যারচর ইউপি চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মানিক জানিয়েছেন, ভারি বর্ষণ ও বন্যার কারণে তার ইউনিয়নের পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের প্রায় ১০হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ এলাকায় ডুবেগেছে টিউবওয়েল। এতে করে ইউনিয়নে বিশুদ্ধ পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এলাকার মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে খাদ্যের জন্য হাহাকার। তিনি আরো জানান, পুরো ইউনিয়ন একদিকে বন্যা কবলিত হয়েছে। অন্যদিকে এলাকার মানুষ আতংকে রয়েছে নদী ভাঙ্গনে ইউনিয়নের হাজী পাড়া এলাকায় অবস্থিত ৩৩হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের টাওয়ার, মসজিদ মাদরাসাসহ নানা স্থাপনা বিলীন হওয়ার আশংকায়। গত ৩ দিনের বন্যায় তার ইউনিয়নে প্রায় ৭৫লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মানিক। হারবাং ইউপি চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন আহমদ বাবর জানিয়েছেন, ভারি বর্ষণ ও বন্যার কারণে ইউনিয়নের রাখাইন পাড়া, জমিদার পাড়া, কালা সিকদারপাড়াসহ ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম পানিতে ডুবে গেছে। জীবন যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের। কৈয়ারবিল ইউপি চেয়ারম্যান শরীফ উদ্দিন চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়নে খিলছাদক, ছোটভেওলা, ডিপকুলসহ প্রায় এলাকার শতশত পরিবার পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। নদী ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। উপজেলার একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বন্যার কারণে উপজেলার শতাধিক গ্রামের ২লাখ মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। স্কুল মাদরাসায় পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যহত হচ্ছে। উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে চকরিয়ার ইউএনও মো: জাকির হোসেন জানিয়েছেন, ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়ন পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।এতে গ্রামীণ অবকাঠামো ও বেড়িবাধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি জানান, দূর্গতদের জন্য তাৎক্ষনিকভাবে জেলা প্রশাসন ১৫মে:টন চাল, পযার্প্ত শুকনো খাবার বরাদ্ধ দিয়েছে। এগুলো বুধবার উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিতরণ করা হবে।

0 Comments