দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির নায়কদের সঙ্গে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকায় তার নাম
ভিওসি ডেস্ক:ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজালের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির নায়কদের সঙ্গে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকায় তার নামও চলে আসে। এ কারণে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের তথ্য পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক সার্কুলারে তার ব্যাংক হিসাব তলব করা হয় বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রেরিত পত্রে সামীম মোহাম্মদ আফজাল পিতা- মৃত আব্দুর রশিদ, মাতা-মৃত আমেনা খাতুন, জাতীয় পরিচয় পত্র নং -১৯৫৭২৬৯৫০৪২৭৮৪৫৩১ জন্ম তারিখ -৩১/১২/১৯৫৭ পাসপোর্ট নং বিজি ০০০৯৭৬০ এর ব্যাংক হিসাব এবং অ্যাকাউন্ট খোলার তারিখ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তারিত বিবরণ চেয়ে সবকটি তফসিলি ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পত্র প্রেরণ করা হয়।
সাবেক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা শামীম মোহাম্মদ আফজাল বিগত ১১ বছর ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। চাকরীর বয়স শেষে ২ দফায় তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান।
দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুনীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে শতাধিক আত্মীয়-স্বজন নিয়োগের মাধ্যমে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। এ নিয়ে কয়েকমাস আগে ইফা কর্মীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে।
শামীম আফজালের ঢাকার মোহাম্মদপুরের জহুরী মহল্লা, বসিলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে নামে-বেনামে প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যায়। তার বিরুদ্ধে ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমীতে প্রশিক্ষণরত ইমামদের সামনে ব্যালে নৃত্য ও কাঙ্গালিনী সুফিয়ার গান আয়োজনসহ বিভিন্ন অনৈসলামিক কার্যকলাপেরও অভিযোগ রয়েছে।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান সামীম মোহাম্মদ আফজাল। গত ১০ জুন ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ইফা ডিজিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ধর্ম মন্ত্রণালয়। তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কেন অবহিত করা হবে না- তা ৭ কার্যদিবসের মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ মার্কেট বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ মহীউদ্দিন মজুমদারকে সাময়িক বরখাস্ত করেন ইফা ডিজি সামীম। এ সংক্রান্ত আদেশকে কেন্দ্র করে এ শোকজের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
এরপর সাপ্তাহিক বন্ধের দিন পদত্যাগপত্র দিতে সামীম মোহাম্মদ আফজাল সংস্থাটির সচিব কাজী নূরুল ইসলামকে অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। পদত্যাগপত্র টাইপও হয়েছিল। শুধু স্বাক্ষর করে জমা দেয়াই ছিল বাকি। তার আগে গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশত ফাইল গাড়িতে করে দফতর থেকে সরানোর চেষ্টা করেন ডিজির আস্থাভাজন একজন পরিচালক। ঘটনা টের পেয়ে এতে বাধা দেন ইফার সচিব কাজী নূরুল ইসলাম। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি ফাইলগুলো জব্দ করে নিজ জিম্মায় নেন। এ ঘটনায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বেঁকে বসেন ডিজি শামীম আফজাল।
ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজালের পদত্যাগের দাবিতে জুন মাসে চারদিন যাবত ইসলামিক ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সারা দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। শামীম মোহাম্মদ আফজালকে শিগগিরই ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে। এমন আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করেন ইফার আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্ণস এর সভা থেকে ডিজির পদত্যাগের কথা থাকলেও আগামী ডিসেম্বর মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত স্বপদেই বহাল রয়েছেন তিনি।
এদিকে আরো চার শতাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন তথ্য চেয়েছে দুদক।বুধবার বাংলাদেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) সাঈদ মাহবুব খানের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দুদক বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত অনুসন্ধান/মামলা চলমান রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যসূত্রে জানা যায়, বিএফআইইউ চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত চার শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। দুদক চলমান অনুসন্ধান ও মামলাসমূহের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য জব্দ করা হিসাবসম‚হের বিবরণীসহ প্রকৃত অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা আবশ্যক।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সুষ্ঠু অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে এখন পর্যন্ত জব্দ করা চার শতাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিবরণী ও প্রকৃত আর্থিক লেনদেনের তথ্য/রেকর্ডপত্র জরুরিভিত্তিতে পাঠিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্তকাজে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
দুদক ও বিএফআইইউ সূত্রে জানা যায়, এরই মধ্যে ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, চট্টগ্রাম-১২ আসনের এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী, যুবলীগের অব্যাহতি পাওয়া চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের অব্যাহতি হওয়া সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার ও সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণ মহানগর শাখার বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চেšধুরী স¤্রাট, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বহিষ্কৃত কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটির কাউন্সিলর কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুবলীগ বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভ‚ঁইয়া, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভ‚ঁইয়া, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সফিকুল আলম ফিরোজ, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বহিষ্কৃত দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিছুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বকুল, গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু ও সহ-সম্পাদক রুপন ভ‚ঁইয়া, যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার জি কে শামীম, গণপ‚র্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও বর্তমান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইয়ের হিসাব জব্দ করেছে বিএফআইইউ। পাশাপাশি অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদেরও ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে সংস্থাটি।
ক্যাসিনো পরিচালনাসহ অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িতদের সম্পদের অনুসন্ধানে অভিযান পরিচালনার গত ৩০ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধান দল গঠন করে দুদক। দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) সাঈদ মাহবুব খানকে তদারক কর্মকর্তা ও পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে প্রধান করে ছয় সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। এর অন্যান্য সদস্যরা হলেন- দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সালাউদ্দিন আহম্মেদ, সহকারী পরিচালক নেয়ামুল আহসান গাজী ও মামুনুর রশিদ চৌধুরী।


0 Comments