Advertisement

জোটবদ্ধ প্রচার চালাবে ২০ দল বৈঠকে যায়নি জামায়াত

আসন্ন পৌর নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। গতকাল সকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। দু-একদিনের মধ্যেই জোটের নেতারা একসঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় বেরিয়ে পড়বেন। বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানান বিএনপির  ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও জোটের প্রধান সমন্বয়ক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এদিকে জোটের বৈঠকে যোগ দেননি দুই শরিক জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের কোন প্রতিনিধি। এছাড়া জোটের মহাসচিব পর্যায়ের এ বৈঠকে গতকাল প্রশ্নের মুখে পড়েন মির্জা আলমগীর। একটি শরিক দলের মহাসচিব জানিয়েছেন, ৫টি পৌরসভায় তাদের দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তারা কোনভাবেই নির্বাচন থেকে নিষ্ক্রিয় হবেন না। বাকি পৌরসভায় তারা জোটবদ্ধ হয়ে প্রচারণায় অংশ নেবেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনার শুরুতেই খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, পৌর নির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাহারের দিন আপনাকে অনেকবার ফোন দিয়েছি। কিন্তু আপনি ফোন ধরেননি। এখন কেন বৈঠক ডেকেছেন? এসময় আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন মো. শাহজাহান। একপর্যায়ে মির্জা আলমগীর জোটের শরিক দলের মহাসচিবদের বলেন, আপনারা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত আছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণেই অনেক সময় এ ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। এরপর শরিক দলের এক মহাসচিব গত দুটি বৈঠকে জোটের দুটি বড় দলের প্রতিনিধিদের অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি উত্থাপন করেন। এছাড়া পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদকে উদ্ধৃত করে ইসলামী ঐক্যজোট আগামী ৭ই জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে- এই বিষয়টির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এসময় মির্জা আলমগীর বলেন, বৈঠকে কে আসলো আর কে চলে গেল- সেটা বড় বিষয় নয়। কেউ না এলে তাকে তো ধরে আনা যাবে না। তিনি বলেন, অতীতে জোট ভেঙে অনেকেই চলে গেছে। বর্তমানে কে কোন লোভে পড়েছে- তা আমাদের বোধগম্য নয়। জোট ভাঙা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাধারণ ঘটনা। এটা নিয়ে বিএনপি মাথা ঘামায় না। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন কিছু নেই। তিনি আরও বলেন, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সব খবর সত্য নয়। বর্তমানে গণমাধ্যম সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অনেক গণমাধ্যমই সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে সংবাদ প্রকাশ করে। ওদিকে শরিক দলের এক মহাসচিব জানিয়েছেন, যেসব পৌরসভায় জামায়াত প্রার্থী দিয়েছে সেসব পৌরসভায় বিএনপির সঙ্গে এখনও কোন ধরনের সমঝোতা হয়নি।  বৈঠক সূত্র জানায়, শরিক দল মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীদের ব্যাপারে আলোচনায় মির্জা আলমগীর বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। সেখানে নিশ্চয় বিষয়টির একটি সুন্দর সমাধান হবে। সমপ্রতি জোটের বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন জামায়াতের কাছে তাদের প্রার্থী তালিকা চেয়েছিলেন। তালিকাটি মোহাম্মদ শাহজাহানের কাছে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু জামায়াত তার কাছে তালিকা দিতে রাজি হয়নি। জোটের শরিক দলগুলোর কয়েকজন মহাসচিব জানান, সামপ্রতিক বছরগুলোতে জোটবদ্ধ কর্মসূচিতে জামায়াতের নিস্পৃহ ভূমিকা, বিগত স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে রহস্যময় অবস্থান ও দু’দলের আলাদা কর্মসূচি পালনের মধ্যদিয়ে বিএনপি-জামায়াতের দূরত্ব দৃশ্যমান হয়েছে। আসন্ন পৌর নির্বাচনে সমর্থিত প্রার্থীদের তালিকা না দেয়া ও বৈঠকে অনুপস্থিত থাকার মাধ্যমে দূরত্বটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন দলটির নেতারা।  এদিকে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের অংশ না নেয়ার বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা আলমগীর মানবজমিনকে বলেন, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামীসহ দলটির নেতারা দলীয় কাজে ময়মনসিংহ সফরে থাকায় বৈঠকে তাদের প্রতিনিধিরা যোগ দিতে পারেননি। আর জামায়াত নেতারা ঢাকার বাইরে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকায় বৈঠকে যোগ দেননি। ওই দুটি দল বৈঠকে যোগ না দিলেও ২০ দলীয় জোট ভাঙার কোন সম্ভাবনা নেই। সেসব গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছে সব মিথ্যা। এদিকে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেন বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতারা। এর পরপরই শরিক দলের মহাসচিবদের বৈঠকের দাওয়াত দেয়া হয়। তবে জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত তারা বিএনপির তরফে এ বৈঠকের কোন দাওয়াত পাননি। ওদিকে পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় মনিটরিং সেল গঠন করেছে বিএনপি। এ ব্যাপারে গতকালের বৈঠকে জোটের শরিক দলের এক মহাসচিব প্রশ্ন রেখে বলেন, বিএনপির তরফে ইতিমধ্যে মনিটরিং সেল গঠন করা হলেও শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। জোটগতভাবে এ মনিটরিং সেল করলে কি আরও বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর হতো না?
জোটের কয়েকজন মহাসচিব জানান, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের রাজনীতি করলেও প্রধান শরিক হিসেবে তারা দলটির দৃষ্টিভঙ্গিতে সন্তুষ্ট নন। জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া বিগত ১৬ মাসে মাত্র ২টি বৈঠক করেছেন। অন্যদিকে প্রধান সমন্বয়ক মির্জা আলমগীর বৈঠক করেছেন মাত্র দুটি। জোটের একাধিক সূত্র জানায়, ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে বিএনপি। হেফাজতের আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ঘটনাপরম্পরায় তারা ইসলামী ঐক্যজোটের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। সর্বশেষ চারটি বৈঠকে যোগ দেয়নি ইসলামী দলগুলোর এ মোর্চা। এছাড়া ইসলামী ঐক্যজোটের কয়েকজন নেতা সমপ্রতি দাওয়াত খেয়েছেন বঙ্গভবনে। নানাভাবে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে আগামী ৭ই জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তারা জোট ছেড়ে যেতে পারে। মির্জা আলমগীরের সভাপতিত্বে বৈঠকে ২০ দলীয় জোটের মহাসচিবদের মধ্যে জাতীয় পার্টির মোস্তফা জামাল হায়দার, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, খেলাফত মজলিশের আহমেদ আবদুল কাদের, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, এনপিপির মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, মুসলিম লীগের শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, পিপলস লীগের সৈয়দ মাহবুব হোসেন, কল্যাণ পার্টির এমএম আমিনুর রহমান, লেবার পার্টির হামদুল্লাহ আল মেহেদি, সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, সহ-প্রচার সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, সহ-দপ্তর সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম, বিজেপির যুগ্ম মহাসচিব আবদুল মতিন সউদ, জমিয়তের উলামা ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মহিউদ্দিন ইকরাম, ডিএলের খোকন চন্দ্র দাস ও এনডিপির মুহাম্মদ ফরিদউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, পৌর নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে প্রচারণা চালাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে- আমরা ২০ দলের ঐকমত্যের প্রার্থীদের সর্বাত্মক সমর্থন জানাব। আগামী যে কয়েকদিন প্রচারণার জন্য অবশিষ্ট রয়েছে, সেই কদিন আমরা সমন্বিতভাবে আমাদের প্রার্থীদের পক্ষে আমরা প্রচাণায় অংশ নেব। শুক্রবার বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরে জোটগতভাবে প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সবখানে জোটের সমন্বিত প্রচারণা শুরু হবে। তাতে জোট নেতারা অংশ নেবেন। যেখানে জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে রয়েছে, সেখানে কিভাবে সমন্বয় করা হবে- জানতে চাইলে মির্জা আলমগীর বলেন, দুই-একটি জায়গায় এ ধরনের সমস্যা আছে। স্থানীয় পর্যায়ে তারা  সমাধান করবেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, ২০ দল এই পৌর নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি পর্যায় হিসেবে নিয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানুষের অধিকার ও বাক স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ২০ দল। নাটোরে সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীর বাসায় সরকারের একজন মন্ত্রীর বৈঠক ও কয়েকদিন আগেও বিভিন্ন জায়গায় মন্ত্রীদের নির্বাচনী প্রচারণায় কথা উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, এতেই প্রমাণিত হয়, নির্বাচন কমিশন মন্ত্রীদের নির্বাচনী প্রচারণায় বিরত করতে পারছেন না। কমিশন ব্যর্থ হচ্ছে। পৌর ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানাতে শিগগিরই একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে বলে জানান তিনি। সেই সঙ্গে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার বন্ধ ও আটক নেতা-কর্মীদের মুক্তিরও দাবি জানান।

Post a Comment

0 Comments