মাওলানা মুহাম্মদ আলমগীর
ইতেকাফের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, কোন জিনিসকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা এবং এর উপর স্বীয় সত্তা ও আত্নাকে আটকে রাখা৷ আর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, আলাহ তালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নিদিষ্ট সময় মসজিদে পূর্নাগ সময় অবস্থান করা৷ যিনি ইতেফাক করেন তাকে মুতাফিক বলে৷
ইতেফাকের উদ্দেশ্যঃ-আত্নশুদ্ধি,আত্নার পবিত্রতা অর্জন,আধ্যাত্নিক উত্কর্ষ সাধন এবং আলাহ পাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভই ইতেকাফের মূল উদ্দেশ্য৷ এ প্রসংঙ্গে আলামা ইবনে রজব (রঃ) বলেছেন ইতেফাকের উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং স্রষ্টার সাথে সম্পক কায়েম করা৷ আলাহর সাথে পরিচয় যতো বেশী হবে সম্পর্ক ও ভালবাসা তথো
গভীর হবে৷ আলামা ইবনুল কাইয়ুম বলেছেন ‘আলাহর পথে যাত্রা অব্যাহত রাখা নির্ভর করে যোগ্য ও সঠিক মনের উপর৷ মন শতদা বিচ্ছিন্ন থাকলে সে পথে অগ্রসর হওয়া যায় না৷ সে জন্যই মনকে আলাহর দিকে ধাবিত করার ব্যবস্থাই হচ্ছে ইতেফাক’৷
আল কোরআ েইতেকাফঃ-(আন ত্বোহহির বায়তিয়া লিততোয়াইফিনা ওয়াল আকে ফিনা) আলাহ বলেন,“ েতামরা আমার ঘরকে তাওয়াফ ও ইতেকাফ কারীদের জন্য পবিত্র রাখ৷ (ওয়া আনতুম আকে ফুওনা ফিল মসাজিদ ) তোমরা হইতেছ মসজিদ সমূহে অবস্থানকারী ” (আল কোরান)৷
রাসূল
(সাঃ) এর জীবনে ইতেকাফ ও সওয়াবঃ-
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত-রাসুলুল্লাহ (সাঃ) রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন৷ কিন্তু ইন্—েকালের বছর তিনি ২০ (বিশ) দিন ইতেকাফ করেন (বোখারী মুসলিম)৷ হযরত আবদুলাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত মহানবী (সাঃ) বলেন-“যে ব্যক্তি আলাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতেকাফ করে আলাহ তার ও দোযখের মধ্যে ৩টি খন্দক পরিমান দুরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন৷ প্রত্যেক খন্দকের দূরত্ব পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের চেয়ে বেশী (তাবরানী ও হাকেম)৷ হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুলাহ (সাঃ) আমৃত্যু রমজানের শেষ দশক ইতেকাফ করতেন৷ (বোখারী ও মুসলিম) হযরত আলী ইবনে হোসাইন (রাঃ) আপন পিতা থেকে বর্নণা করেন রাসুল (সাঃ) বলেছেন রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করাই দু হজ্ব ও দুই ওমরার সমান সওয়াব পাবেন৷ (বাইহাকী) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত ইতেকাফ কারী সর্ম্পকে রাসুল (সাঃ) বলেছেন ইতেকাফ কারী গুনাহ থেকে বিরত থাকে বলে, তাকে সকল নেক কাজের কর্মী হিসাবে বিবেচনা করে অনেক সওয়াব দান করা হয়৷ (ইবনে মাজাহ) হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন মহানবী (সাঃ) যখন ইতেকাফের ইচ্ছা করিতেন ফজরের নামাজ পরতেন এবং ইতেকাফের জন্য প্রবেশ করতেন৷ (আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)
ইতেকাফ তিন প্রকারঃ- ১.ওয়াজিবঃ-কেউ মানত করলো যে আমার অমুক কাজ হয়ে গেল ইতেকাফ করবো৷ অথবা কোন শর্ত ছাড়াই ইতেকাফের
মানত করলো৷ ২.সুন্নতে মুয়াক্কাদাঃ-রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কেফায়া মহলার কোন একজন ইতেকাফ করলে সকলের প¶ থেকে আদায় হয়ে যাবে৷ আর কেউ ইতেকাফ না করলে সকলেই গুনাহগার হবে৷ ৩.মুস্—াহাব ইতেকাফঃ-রমজানের শেষ দশ দিন ব্যতীত অন্য যে কোন সময়ে যে কোন মেয়াদের ইতেকাফ করা মুস্—াহাব৷
ইতেকাফের শর্তঃ- ১.ইতেকাফকারীকে মুসলমান হতে হবে৷ ২.পাগল না হওয়া সুস্থ মস্—িক হওয়া৷ ৩.বালেগ ও আকেল হওয়া৷ ৪. িনয়ত করা৷ ৫.পবিত্র থাকা৷ ৬.পূনাঙ্গ সময় মসজিদে অবস্থান করা৷ ৭.
েরাজা রাখা৷ (দুবর“ল মুখতার)
ইতেকাফ কারীর জন্য সুন্নত হলোঃ- হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিস৷ ১.
েরাগী দেখতে না যাওয়া৷ ২.জানাজায় অংশ গ্রহন না করা৷ ৩.স্ত্রীকে স্পর্শ না করা এবং সহবাস না করা৷ ৪.খুব বেশী প্রয়োজন না হলে মসজিদ থেকে বের না হওয়া৷ (আবু দাউদ)
যে সব কারনে ইতেকাফ ভেঙ্গে যায়ঃ- ১.ইতেকাফের মেয়াদেও ভিতরে সহবাস করলে ওয়াজিব ও সুন্নত ইতেকাফ ভেঙ্গে যায় এবং ক্বাজা করতে হয়৷ ২. েকান রোগীকে দেখা, ডুবন্—লোককে বাচানোর চেষ্টা করা,-আগুন নেভানো ইত্যাদীর কারনে মসজিদ থেকে বেরোলেও ইতেকাফ ভেঙ্গে যায়৷ তবে তাতে গুনাহ হবেনা৷ ৩.ইতেকাফ কারীকে জোর পূর্বক কেউ বাহিরে নিয়ে গেল, মহাজন দেনার দায়ে টেনে বের করে নিয়ে গেল বা পুলিশ গ্রেফতার করে নিলেও ইতেকাফ ভেঙ্গে যাবে৷ ৪.প্রাকৃতিক বা শরীয়ত সম্মত কারনে বাইরে গিয়ে সংগত কারনে ফিরে আসতে বিলম্ব হলেও ইতেকাফ থাকবেনা৷ ৫.ওয়াজিব ইতেকাফ ও রমজানের সুন্নাত ইতেকাফের জন্য রোজা জর“রী নফল ইতেকাফের জন্য রোজা শর্ত নয়৷
ইতেকাফের স্থানঃ- ইতেকাফের জন্য সবোর্ত্তম স্থান হলো মসজিদুল হারাম (কাবা শরীফ) এর পর মসজিদে নববী, তার পর মসজিদুল আকসা (বাইতুল মোকাদ্দিস), অতপর এলাকার বৃহত্তম জামে মসজিদ এবং এর পর মহান আলাহর ওয়াকতিয়া মসজিদ৷ যে মসজিদে জামায়াতের ব্যবস্থা তথা ইমাম ও মুয়াজ্জিন আছে, চাই নিয়মিত জামায়াত হোক বা না হোক, সেই মসজিদে ইতেকাফের নিয়তে অবস্থান করবে৷
ইতেকাফ কারীর জন্য মাকর“হ বিষয়ঃ- ১.
েবচাকেনায় অংশ নেওয়া৷ ২. েয কথায় গুনাহ হয় তা বলা ইতেকাফ অবস্থায় নিরর্থক বাজে ও বেহুদা কথা এবং কাজ মাকর“হ ৷ ৩.আলাহর নৈকট্য লাভের উপায় ভেবে চুপ থাকা মাকর“হ৷ অন্য কথায় চুপ থাকাকে এবাদত মনে করে কোন কথা না বলা৷
যে সব কাজ দ্বারা ইতেকাফ বাতিল বা ভঙ্গ হয়ঃ- ১.মসজিদ বা ইতেকাফের স্থান থেকে নিস্প্রয়োজনে বের হলে৷ ২.ইসলাম পরিত্যাগ করে মুরতাদ হলে৷ ৩.অজ্ঞান বা পাগল হলে৷ ৪. েময়েদের মাসিক দেখা দিলে৷
৫.সন্—ান ভূমিষ্ঠ হলে বা গর্ভপাত হলে৷ ৬.সহবাস করলে৷ ৭.বীর্যপাত ঘটালে৷ ৮.মুতাফিককে কেউ জোর পূর্বক মসজিদ থেকে বের করে দিলেও ইতেকাফ বাতিল হয়ে যাবে৷
মুতাফিকের জন্য জায়েয কাজ সমূহঃ- ১.প্রয়োজনীয় কজের জন্য মসজিদের বাহিরে যাওয়া৷ ২.মসজিদে পানাহার ও ঘুমানো৷ ৩.প্রয়োজনে অন্যের সাথে কথা বলা৷ ৪.
িনজ পরিবারের লোকদের ও আগত মেহমানদের বিদায় জানানোর জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া৷ ৫.যাদের খাবার পৌছে দেওয়ার লোক নেই তারা খাবার খেতে বাহিরে যেতে পারবেন৷ ৬.যদি ইতেকাফের মসজিদে জুমায়ার নামাজ না হয়, তাহলে জুমা আদায়ের জন্য অন্য মসজিদে যাওয়া৷ উলোখিত প্রয়োজন পুরনের পর মুতাফিক এক মুহর্তও বাহিরে দেরি করবেন না এবং অন্য কাজে লিপ্ত হবেন না৷
মহিলাদের ইতেকাফঃ- হাদিস থেকে জানা যায় যে মহিলারাও ইতেকাফ করতে পারে৷ মহিলাদের ইতেকাফ গৃহ কোনে
(সালাত আদায়ের স্থানে) বাঞ্চনীয়৷ তবে মহিলাদের ইতেকাফ স্বামীর অনুমতি আবশ্যক৷ মাসিক দেখা দিলে, গর্ভপাত হলে কিংবা সন্—ান প্রসব করলে ইতেকাফ ছেড়ে দিতে হবে৷
ইতেকাফ কারীর জন্য আমল সমুহঃ- ১.পাচ ওয়াক্ত সালাত ও তারাবীহ জামায়াতের সাথে আদায় করা৷ ২.সালাতুল তাহাজ্জুদ আদায় এবং অভ্যাস করা৷ ৩.অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াত করা৷ ৪.অর্থসহ হাদিস অধ্যায়ন করা৷ ৫.জর“রী মাসলা মাসায়েল সহ ইসলামের গুর“ত্ব পূর্ন বিষয়ে পড়ালেখা গবেষণা ও চিন্—া ভাবনা করা৷ ৬.নফল ইবাদত, নামাজ, যিকির ও দোয়া করা৷ ৭.রাসুল (সাঃ) এর উপর দর“দ পাঠ করা৷ ৮.দরসে কুরআন, দরসে হাদিস ও ওয়াজ এবং দাওয়াতে দ্বীনের কাজ করা৷ ৯.ইসলামের মৌলিক ও গুর“ত্ব পূর্ন বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব হলে৷ ১০.আলাহর দরবারে কান্নাকাটি করা ও নিজ জীবনের গুনাহ সমুহের তাওবাহ ইস্—িগফার করা৷ ১১.মাতা, পিতা, আত্মীয় স্বজন সহ সকল মুসলমানদের জন্য দোয়া করা৷
ইতেকাফ কারী জা অজর্ন করতে পােরঃ- ১.আত্বার পরিশুদ্ধি লাভের জন্য ইতেকাফ একটি উত্তম ব্যবস্থা৷ পার্থিব জীবনে মানুষ হাজারো ব্যস্—তা ও ঝামেলার মধ্যে দিয়ে জীবন যাপন করতে হয়৷ শয়তান মানুষের পেছনে সব সময় লেগে আছে৷ প্রতিটি কাজে সে ধোঁকা দেয়ার চেষ্ঠা করে৷ তাই দুনিয়ার সব ঝামেলা পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন হয়ে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আত্বার পরিশুদ্ধি করতে ইতেকাফ ভুমিকা পালন করে৷ ২.আলাহর নৈকট্য লাভঃ- সংসার, সামাজিক যাবতীয় কাজ কর্ম ও লেনদেন থেকে কিছু দিনের জন্য মুক্ত হয়ে মানুষ একান্—ভাবে আলাহর ধ্যানে মশগুল থাকার সুযোগ পায় ইতেকাফের মাধ্যমে৷ এ সুযোগ ইতেকাফ কারী আলাহর নৈকট্য লাভে স¶ম হয়৷ ৩.আলাহর পথে চলার অনুপ্রেরনা সৃষ্টিঃ- ইতেকাফ কারী ইতেকাফে বসে আলাহর আজাব ও শাস্—ির কথা ভেবে যেমন ভীত-কম্পিত হয়ে ওঠে৷ ঠিক তেমনি তার পুর“স্কারের কথা স্বরন করে আনন্দে উদ্বোলিত হয়ে ওঠে৷ আলাহর পথে চলার জন্য৷ আলাহর রাহে নিজকে কুরবানী করার জন্য সে মানসিক ভাবে সিদ্দান্—পৌছাতে স¶ম হয়৷ ৪. ৈনতিক ও আধ্যাত্বিক প্রভাব সৃষ্টিঃ-ইতেকাফ মানুষের মনের উপর এমন নৈতিক ও আধ্যাত্বিক প্রভাব সৃষ্টি করে যা তাকে দ্বীর্ঘ দিন আলাহর পথে তথা তাকওয়ার পথে পরিচালিত করে৷ ৫.আলাহর প্রতি ভালবাসাঃ-ইতেকাফ কারী যেহেতু নিজের স্ত্রী, পুত্র পরিজন সহ সব কিছু সাময়ীক ভাবে ত্যাগ করে আলাহর সন্—ুষ্ঠির জন্য ইতেকাফ করে৷ আলাহ ছাড়া কাছে কাউকে পাওয়া যায় না৷ একান্— ভাবে আলাহর সাথে গভীর সর্ম্পক সৃষ্টি করার মহান, সুযোগ কাজে লাগিয়ে তার ভালবাসা অর্জন করা যায়৷ সর্বপরি ইতেকাফ এর মাধ্যমে প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তি আত্বগঠন করে আলাহর একনিষ্ট বান্দা ও তার দ্বীনের সৈনিক হওয়ার সুযোগ পায় আলাহ আমাদের সকলকে ইতেকাফের মাধ্যমে আলাহর নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান কর“ন আমিন৷
লেখক, গবেষক, খতিব, সংগঠক ও
সেক্রেটারী, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি,ককস্বাজার জেলা৷
মোঠোফোন-০১৮১৯-৮২ ১৭ ৭০


0 Comments