শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া : এএফপিসবাইকে চমকে দিয়ে সিরিয়ায় ‘শাস্তিমূলক’ অভিযান পিছিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ভিয়েতনামযুদ্ধের পর থেকে সাম্প্রতিক কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ধার না ধারলেও আইন অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওবামা। এ বিষয়ে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য নন বলেই দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্টরা। এ পর্যন্ত কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবে সমর্থনের আভাস পাওয়া গেছে। সিরিয়ার মাটিতে মার্কিন গোলা পড়া এখন তাই হয়তো সময়ের ব্যাপার মাত্র।
পর্যবেক্ষকদের অনেকে সিরিয়া ইস্যুতে কংগ্রেসের অনুমোদন চাওয়াটাকে ওবামার কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, কংগ্রেস অধিবেশনে সিরিয়ার বিষয়ে বিতর্ক ও ভোটাভুটির সময় অর্থনীতিসহ মার্কিন অভ্যন্তরীণ সংকট আর দ্বন্দ্বগুলোকে আড়ালে ঠেলে দিতে সক্ষম হবেন তিনি। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা মনে করেন, মাঝখানে কিছুটা সময় পেয়ে বরং ভালোই হলো। এই সময়ে সিরিয়ায় হামলার পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে তৎপরতা চালাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। আবার কারও মতে, ওবামা জাতিসংঘের তদন্ত দলের বিষয়টিও মাথায় রেখেছেন। তাদের প্রতিবেদনে রাসায়নিক হামলার বিষয়টি প্রমাণিত হলে হামলা জায়েজ করা সহজ হবে।
মার্কিন নৌবাহিনীর ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করা যুদ্ধজাহাজগুলো নতুন অবস্থান নিতে শুরু করেছে। জাহাজের ক্ষেপণাস্ত্রে যদি না কুলায়, তাহলে বিমান হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে দুটি বিমানবাহী রণতরী। এ ছাড়া প্রয়োজন হলে তুরস্ক ও সাইপ্রাসের সেনাঘাঁটিও ব্যবহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন আইনপ্রণেতারা পদাতিক সেনা ব্যবহারের বিরুদ্ধে। তাঁরা কেবল আকাশপথে হামলা চালানোর বিষয়টিকে সমর্থন করেছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামাও স্থল সেনা না পাঠানোর কথা ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন। ‘দরকার হলে’ ফরাসি বিমানবাহিনীও যোগ দেবে মার্কিন বিমান হামলায়।
যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বিবেচনায় থাকে এর প্রতিক্রিয়া বা পরিণতির কথাও। একটি যুদ্ধে আর্থিক দিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয় জড়িত। কাজেই এখানে একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন চলে আসে। সিরিয়ার আসলে কী ধরনের হামলা চালানোর প্রস্তাব করা হয়েছে? এতে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে? এ ধরনের হামলা চালানো যৌক্তিক কি না? যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে কতজন সঙ্গে থাকবে? কংগ্রেসের অনুমোদন চাওয়াটা ওবামার নিছক কৌশল?
তবে সম্ভাব্য যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োগটা কীভাবে হবে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, তাদের পশ্চিমা মিত্ররাও দ্বিধায় ভুগছে। মার্কিন আইনপ্রণেতারা যে সীমিত হামলার শর্ত আরোপ করেছেন, এতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে হামলা চালানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, ইরাক ও আফগানিস্তানে ‘ঢালাও অভিযান’ চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে খেসারত দিয়েছে, এক দশক পরও তার জের টানতে হচ্ছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ চেয়ারম্যান জেনারেল মার্টিন ডেম্পসি যে পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন, তাতে সিরিয়া অভিযান চলবে বিভিন্ন ধাপে। প্রথম ধাপে মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ক্ষেপণাস্ত্রের স্থাপনা ও সেনা কমান্ডের প্রধান দপ্তরগুলো। একই সঙ্গে সিরিয়ার বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষা স্থাপনাও হতে পারে হামলার লক্ষ্যবস্তু। পাশাপাশি চলবে বাশারবিরোধী বিদ্রোহীদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহের কাজও।
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে ‘উড্ডয়ন নিষিদ্ধ’ এলাকা তৈরি। এতে বিদ্রোহীদের দমনে প্রেসিডেন্ট বাশারের যুদ্ধবিমান নিজ দেশের আকাশসীমারই কিছু অংশে উড়তে পারবে না। এরপর যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তুরস্ক ও জর্ডানের সীমান্তে একটি বাফার জোন গড়ে তোলার চেষ্টা চালাবে। সেখানে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহীরা বাশারের বিরুদ্ধে জোরালো হামলা চালাতে পারবে। সিরিয়ায় মার্কিন অভিযানের সর্বশেষ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ। এই মজুদ ধ্বংস করার চেয়ে কবজা করার দিকে বেশি মন দেবে তারা। কারণ, রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করতে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সিরিয়ার পরিস্থিতি এখন সে রকম নেই।
আক্রান্ত হলে সিরিয়া বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান অনেক জোরদার করতে পারে। যুদ্ধকে ছড়িয়ে দিতে তুরস্ক ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বসতে পারে। অবশ্য দুটি দেশেই ক্ষেপণাস্ত্ররোধী ব্যবস্থা খুব মজবুত। জর্ডানে পেছন থেকে হামলা চালাতে পারে কট্টর ইসলামি শিয়া গোষ্ঠী হেজবুল্লাহও। সিরিয়ায় হামলার সূত্র ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে হেজবুল্লাহর পুরোনো বিরোধ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এভাবে সিরিয়ায় মার্কিন অভিযান বড় ধরনের সংঘাত আর ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা ঘটাতে পারে।

