ঢাকা: নেতৃত্ব সঙ্কট, নিবন্ধন বাতিল বা দল নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কাসহ নানা কারণে মহাসঙ্কটে পড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে সঙ্কট ততই ঘনীভূত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সাজা দেয়ার পাশাপাশি দল হিসেবে জামায়াতকেও অভিযুক্ত করেছে ট্রাইব্যুনাল। প্রথম দিকে জামায়াতকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও সম্প্রতি দুই নেতার রায়ে সরাসরি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
এতে দলটি নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। এদিকে শীর্ষ নেতারা আটক থাকায় ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে চলছে জামায়াতে ইসলামীর কার্যক্রম। গ্রেফতার আতঙ্কে কেন্দ্র ও মহানগর থেকে শুরু করে প্রায় সব শাখার নেতারাই আছেন আত্মগোপনে। সংশ্লিষ্ট দলীয় কার্যালয়গুলোও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে। এ অবস্থায় একের পর এক শীর্ষ নেতাদের সাজা হওয়ায় অনেকটা হতাশ জামায়াতের বর্তমান নেতাকর্মীরা। নেতৃত্ব সঙ্কটসহ দলটি সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। এরই মধ্যে দলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে হাল ধরেছেন তৃতীয় সারির নেতারা। দল চালাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি বিকল্প নেতৃত্ব চূড়ান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, সরকার চাইলে দেশে বিরাজমান দুটি আইনে জামায়াতে ইসলামীকে যে কোনো সময় নিষিদ্ধ করতে পারে। সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে জেএমবিসহ অনেক দলকে এই আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের রায় কোনো বিষয় নয়। জামায়াত নিষিদ্ধ করার অনেক সুযোগ আছে।
ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক দেয়া দুটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রায় হাতে পাওয়ার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তাছাড়া ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্তরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না এমন বিধান রেখে আরপিও সংশোধন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এদিকে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল সংক্রান্ত হাইকোর্টে দায়ের করা একটি রিটের শুনানি শেষে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এ নিয়েও উদ্বিগ্ন জামায়াত।
তবে সঙ্কটময় পরিস্থিতির কথা স্বীকার করতে নারাজ জামায়াতের নেতারা। দল নিষিদ্ধ করারও কোনো সুযোগ নেই বলে তাদের মন্তব্য। নেতাদের আশা, আটক শীর্ষ নেতারা মুক্ত হয়ে আবারও দলের হাল ধরবেন। সেক্ষেত্রে তাদের মামলার চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্তদের দিয়েই দল চালানো হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ এমপি এসব বিষয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি জামায়াতের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজনৈতিক নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুকে সামনে এনে জামায়াতকে দুর্বল করার যে দুরভিসন্ধি করেছিল তাতে তারা ব্যর্থ হয়ে গেছে। ট্রাইব্যুনালে যা হচ্ছে তাকে সাজানো নাটক হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, আশা করি আমাদের নেতারা মুক্তি পাবেন। রাজনৈতিক হয়রানির কারণে দল চালাতে একটু সমস্যা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি। গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দল চালানো হচ্ছে বলেও তিনি জানান। এখনও বিকল্প নেতৃত্বের কথা ভাবা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান বলেন, জামায়াতকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করে ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছেন তা আমলে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে তারা মন্তব্য করতে পারেন না। নেতাদের রায়ের পাশাপাশি জামায়াত সম্পর্কে মন্তব্য করে মূল মামলাটিকে হালকা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে প্রমাণ করেছেন। আটকের প্রায় তিন বছর পর মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে এরই মধ্যে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত হয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান।
একই অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত হয়েছেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা। সোমবার ৯০ বছর কারাদ-প্রাপ্ত হন দলের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম। বুধবার ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের। বিচার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে দলের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর।
এছাড়া অভিযোগ গঠন ও তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে দলের নায়েবে আমির মাওলানা একেএম ইউসুফ ও মাওলানা আবদুস সুবহান, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলীর মামলার। মানবতাবিরোধী অপরাধ ছাড়াও বিভিন্ন অভিযোগে দীর্ঘদিন কারাগারে আটক আছেন দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও মিয়া গোলাম পরওয়ার, নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যাপক তাসনীম আলম প্রমুখ। এছাড়া মহানগর ও জেলা পর্যায়সহ সারা দেশের ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মী কারাগারে আটক আছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে যেসব নেতা বর্তমানে দল চালাচ্ছেন তারাও স্বাভাবিকভাবে কোনো কাজ চালাতে পারছেন না। গ্রেফতার আতঙ্ক নিয়ে আছেন আত্মগোপনে। জামায়াতের নায়েবে আমির মকবুল আহমদ আছেন দলের ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্বে। বিভিন্ন মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হওয়ায় আত্মগোপনে থেকেই কাজ চালাচ্ছেন তিনি। ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বে রয়েছেন তরুণ নেতা ও ঢাকা মহানগরের আমির মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। ট্রাইব্যুনাল অবমাননার একটি মামলায় তিন মাসের সাজাপ্রাপ্তসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত এই নেতাও আত্মগোপনে। তাছাড়া ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারির দায়িত্ব পাওয়ার পর ঢাকা মহানগর আমির হিসেবে তার স্থলে আর কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এই শাখার নায়েবে আমির হামিদুর রহমান আযাদও বর্তমানে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য। ট্রাইব্যুনাল অবমাননার অভিযোগে তিন মাসের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনিও আছেন আত্মগোপনে। সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে মহানগরের সেক্রেটারির দায়িত্বপ্রাপ্ত নুরুল ইসলাম বুলবুল পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন আছেন। জামায়াত সমর্থিত ছাত্রসংগঠন শিবিরের শীর্ষ নেতারাও বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আটক আছেন। দলের এ দুর্যোগে ১৮ দলীয় জোটপ্রধান বিএনপিরও তেমন কোনো সমর্থন পাচ্ছে না দলটি। এ অবস্থায় জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রতি স্থবির হয়ে গেছে। ছাত্রসংগঠন শিবির নিজেদের উদ্যোগে কিছুটা সক্রিয় থাকলেও জামায়াতের দ্বিতীয়-তৃতীয় সারির নেতারা এখন লাপাত্তা। আলোকিত বাংলাদেশ।


0 Comments