এম এ আহাদ শাহীন
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী প্রার্থীর পরাজয়ের পর চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছে দলটি। পাঁচ বছর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নান গাজীপুর-৩ আসনে
আওয়ামী লীগের প্রার্থী রহমত আলীর কাছে এক লাখ ২৯ হাজার ২৯ ভোটে হেরেছিলেন। সেই তিনিই মেয়র নির্বাচনে এক লাখেরও বেশি ভোটে হারিয়েছেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে। গাজীপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মতো বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, জাতীয় ইস্যুগুলো এ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রার্থী বা এলাকার উন্নয়নের কথা আমলে নেননি ভোটাররা।
গাজীপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, কয়েক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ফলাফলের প্রভাব পড়েছে এই নির্বাচনে। এর বাইরে নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের অপর প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের সরে যাওয়া, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ইস্যু, শেয়ারবাজার ও ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়ম নিয়ে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে সরকারের উদাসীনতা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। নির্বাচনের আগে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ এনে এম এ মান্নানের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংবাদ সম্মেলনও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর বিপক্ষে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীপুরের একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই পক্ষই সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। সিটি করপোরেশন এলাকায় গাজীপুরের স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র ৩৮ শতাংশ। বাকি সবাই বহিরাগত। তাঁরা বাইরে থেকে এসে বসবাস করছেন অথবা বিভিন্ন কলকারখানায় কাজ করছেন। এ নির্বাচনে সব অঞ্চলের মানুষের মতের প্রতিফলন ঘটেছে। আওয়ামী লীগ পিছিয়ে পড়ার পেছনে জাহাঙ্গীর আলম ইস্যুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। জাহাঙ্গীরের সমর্থকদের ৩০ শতাংশ আওয়ামী লীগের কর্মী। বাকি ৭০ শতাংশ ভোট আজমত উল্লা খানের পক্ষে না-ও পড়তে পারে। কারও কারও মতে, আজমত উল্লা ২০০৭ সালে সংস্কারপন্থী নেতাদের প্রতিনিধিত্ব করেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ এই নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ছিল না।
দলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা বলেন, নির্বাচনে হেফাজতে ইসলাম ইস্যুটিকে পুঁজি করে বিএনপি বহু মানুষের সমর্থন আদায় করেছে।
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) প্রধান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, বিরোধী দল ধর্মকে ইস্যু করে যেমন ভোটারদের কাছে গেছে, তেমনি আজমত উল্লা খানকে ধর্মকে ইস্যু করতে দেখা গেছে। ধর্মীয় লেবাসধারী লোকজনের আনাগোনা দেখা গেছে তাঁর পাশেও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে হেরে গেছেন তিনি। ধর্মকে ইস্যু করার পাশাপাশি আর্থিক খাতে অনিয়ম নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব ফেলেছে।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, স্থানীয় হলেও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের রূপ পেয়েছিল। তাঁর মতে, ক্ষমতায় থাকার সময় শাসক দল কিছুটা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে থাকে। তার মধ্যে অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো নির্বাচনী ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংক, শেয়ারবাজারে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা এবং এর প্রতিকার না হওয়ায় সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। পাশাপাশি নির্বাচনের দু-তিন দিন আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর কর ফাঁকি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করায় বিষয়টি আজমত উল্লার জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে। নির্বাচনের আগে আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংবাদ সম্মেলন করা উচিত হয়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী ইফতেখারুজ্জামানও মনে করেন, নেতিবাচক প্রচার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি। তাঁর মতে, গাজীপুরের নির্বাচনে প্রার্থী বা এলাকার উন্নয়ন নিয়ে মাথা ঘামাননি ভোটাররা।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনীতিকেরা নিজেদের যা কিছু ভালো তা নিয়ে ভোটারদের কাছে যান না। তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নেতিবাচক দিকগুলোকে নিয়ে প্রচার করেন। এতে মূলত বিরোধীদলীয় প্রার্থী জনপ্রিয়তা পান।’
১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরের সবগুলো আসনে জয় পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। ১৯৮৬ সালে গাজীপুর পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর সেখানে কখনো জয় পায়নি বিএনপি। ১৯৯৫ সালের পর টঙ্গী পৌরসভার নির্বাচনে কখনো হারেনি আওয়ামী লীগ।
গত ২২ বছরে গাজীপুর শহরের সংসদীয় আসন কিংবা সেখানকার কোনো স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হননি।
সম্প্রতি চারটি সিটি করপোরেশনে হেরে যাওয়ার পর গাজীপুর সিটি করপোরেশনে জিততে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল আওয়ামী লীগ। এ নির্বাচনে ৫৭টি ওয়ার্ডে ৫৭ জন সাংসদ প্রচারে অংশ নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের শিল্পী-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাও নিয়মিত নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। তবু শেষ রক্ষা হয়নি।
এদিকে পর পর পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ে মুষড়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। অব্যাহত এই ফল বিপর্যয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মনোবলে চরম ধাক্কা দিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন বেশ কয়েকজন সভাপতিম-লীর সদস্য ও মধ্যস্তরের নেতা। দলটি এখন একমাত্র সান্ত্বনা খুঁজছে, ‘তত্ত্বাবধায়ক নয়, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব’।
আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজত আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। এটা মোকাবিলা করতে আসন্ন রমজান মাসে দলের সব কেন্দ্রীয় নেতা বিভিন্ন জেলা সফর করবেন। সাংসদেরা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সরকারের সাফল্য প্রচার করবেন।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘গাজীপুরসহ অন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুধু জাতীয় কেন, সমগ্র রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। আগে যে রাজনৈতিক কৌশলে কাজ করেছি, সেটার পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঠেকানো যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমি আমার আসনে ছয়বার নির্বাচিত সাংসদ; এর পরও আমি এই আসন নিয়ে ভীত। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের আর কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
জাতীয় নির্বাচনে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলের প্রভাব ফেলার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ওবায়দুল কাদের সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি ছিল স্থানীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচন আলাদা বিষয়। এই নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না, তবে পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ভুল সংশোধনের কাজে লাগাতে চাই।’
দলটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির কৌশল, সমন্বয়হীন প্রচার, স্থানীয় সাংসদদের জনবিচ্ছিন্নতা, এলাকার উন্নয়ন কর্মকা-ে জনপ্রতিনিধিদের নজর না দেওয়া, সর্বোপরি সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৪ দল-সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়ের বিষয়ে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে দলীয় সভানেত্রী বৈঠক করবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমাদের সাংগঠনিক ব্যর্থতার কারণেই চার সিটি করপোরেশন ও গাজীপুরের মতো আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে এই পরাজয়। তবে পরাজয় থেকে মানুষ শিক্ষা পায়। আমাদের সভানেত্রী এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি দেশে আসার পর দলের সার্বিক অবস্থা ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে করণীয় নির্ধারণে আলোচনা করা হবে।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মাহবুব উল আলম হানিফ। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ডজন খানেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সবার কণ্ঠেই হতাশা। সবাই যেন মুষড়ে পড়েছেন। মর্যাদার প্রশ্ন হওয়ায় গাজীপুরে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছিল দলটি। কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ায় প্রচ- হোঁচট খেয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বে দেওয়া দলটি।

0 Comments