Advertisement

গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদণ্ড

ঢাকা: স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে এ রায় ঘোষণা করা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্যানেল গোলাম আযমের রায় দেন।
রায় পড়াকালীন সময়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘পাঁচ অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিই প্রমাণিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতন, উসকানির ২৮টি ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার ২২টি ঘটনা, ষড়যন্ত্র ও শান্তি কমিটি গঠনের পরিকল্পনা সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।’

এক নম্বরে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে গঠিত প্রথম অভিযোগটি মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। এই অভিযোগে ছয়টি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: একাত্তরের ৪ এপ্রিল গোলাম আযম, নুরুল আমীন, মৌলভী ফরিদ আহমেদ, খাজা খয়েরউদ্দিন, এ কে এম শফিকুল ইসলাম, মাওলানা নুরুজ্জামান, হামিদুল হক চৌধুরী, মোহসিনউদ্দিন আহমেদ, এ টি সাদীসহ ১২ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে নাগরিক শান্তি কমিটি গঠনের ষড়যন্ত্র করেন। আগের সাক্ষাতের সূত্র ধরে ৬ এপ্রিল গোলাম আযম আবারও টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেন এবং পূর্বোল্লিখিত ষড়যন্ত্রে অংশ নেন। ১৯ জুন এই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক করেন। ১ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে আবারও ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে মোকাবিলার জন্য রাজাকার বাহিনীর শক্তি বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

দুই নম্বরে পরিকল্পনার অভিযোগ: দ্বিতীয় অভিযোগে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়েছে। আদেশে এখানে তিনটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। ৪ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠকে সারা দেশে শান্তি কমিটি গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৯ এপ্রিল গোলাম আযম ও অন্যরা ঢাকায় ১৪০ সদস্যের নাগরিক শান্তি কমিটি গঠন করেন। ৪ মে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে এ কিউ এম শফিকুল ইসলামের বাসভবনে খাজা খয়েরউদ্দিনের সভাপতিত্বে শান্তি কমিটির সভা হয়, যেখানে গোলাম আযম উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠনের বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়।

তিন নম্বরে উসকানির অভিযোগ: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে গঠিত তৃতীয় অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে উসকানির ২৮টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে: ৭ এপ্রিল গোলাম আযম এক যুক্ত বিবৃতিতে স্বাধীনতাকামী মানুষকে ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাঁদের যেখানেই দেখা যাবে, সেখানেই ধ্বংস করা হবে। ২২ এপ্রিল শান্তি কমিটির সভা শেষে এক বিবৃতিতে তিনি অধীন সংগঠনগুলোর সদস্যদের ‘দেশপ্রেমিক নাগরিক’ উল্লেখ করে দেশের সাধারণ নাগরিকদের ধ্বংস করার আহ্বান জানান। ১৭ মে ঢাকায় এক সভায় স্বাধীনতা আন্দোলনকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ’ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ উল্লেখ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নমের সেনা অভিযানের প্রশংসা করেন। একাত্তরের ১৬ জুলাই রাজশাহী, ১৮ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ৪ আগস্ট খুলনা, ৭ আগস্ট কুষ্টিয়া প্রভৃতি এলাকায় আয়োজিত বিভিন্ন সভায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও উত্তেজনাকর বক্তব্য দেন। ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের ২৫তম আজাদী দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে, ১৭ ও ২৩ আগস্ট দলীয় সভায় এবং ২৬ আগস্ট পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত দলীয় অনুষ্ঠানে গোলাম আযম বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। ১৭ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল এডুকেশন সেন্টারে তিনি শিক্ষা গ্রহণরত রাজাকারদের শিবির পরিদর্শন করে তাঁদের সশস্ত্র হওয়ার আহ্বান জানান। ৩ অক্টোবর ঢাকায় মজলিসে শুরার সভায় তিনি একই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দেন।

চার নম্বরে সহযোগিতার অভিযোগ: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে গঠিত চতুর্থ অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতা বা সম্পৃক্ততার ২২টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। ৪ ও ৬ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে গোলাম আযমসহ অন্যরা সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ৯ এপ্রিল গোলাম আযমের সহযোগিতায় নাগরিক শান্তি কমিটি গঠিত হলে ১৫ এপ্রিল এর নাম পরিবর্তন করে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি করা হয়। শান্তি কমিটির ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটির একজন সদস্য ছিলেন গোলাম আযম। ১৮ জুন লাহোর বিমানবন্দরে তিনি বলেন, জনগণ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে চায়। ১৯ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে তিনি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবিলার জন্য রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানান। পরদিন লাহোরে জামায়াতের পশ্চিম পাকিস্তান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে দুষ্কৃতকারীরা সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের প্রতিরোধে ও শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রসজ্জিত হওয়া উচিত।

পাঁচ নম্বরে হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগে হত্যা ও নির্যাতনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের সিরু মিয়া একাত্তরে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় দারোগা (সাব-ইন্সপেক্টর) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৮ মার্চ তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ১৪ বছরের ছেলে আনোয়ার কামালকে নিয়ে কুমিল্লার নিজ বাড়িতে যান। সেখানে সিরু মিয়া শরণার্থীদের ভারতে যাতায়াতে সাহায্য করতেন। ২৭ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে কসবা থানার তন্তর চেকপোস্টের কাছে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেসহ ছয়জন ভারতে যাওয়ার সময় রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে। তাদের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে কয়েক দিন নির্যাতনের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্বামী-সন্তানের ধরা পড়ার খবর পেয়ে সিরু মিয়ার স্ত্রী গোলাম আযমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সিরু মিয়ার ভগ্নিপতি ছিলেন গোলাম আযমের দুই ছেলে আজমী ও আমীনের শিক্ষক। তিনি গোলাম আযমের কাছে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ জানান। গোলাম আযম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির নেতা পেয়ারা মিয়ার কাছে একটি চিঠি পাঠান, যাতে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে হত্যার নির্দেশ ছিল। চিঠি পাওয়ার পর ঈদের দিন রাতে সিরু মিয়াসহ ৩৯ জনকে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকার ও আলবদরদের সহযোগিতায় কারাগার থেকে বের করে নিয়ে পৈরতলা রেলব্রিজের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ৩৮ জন মারা গেলেও একজন প্রাণে বেঁচে যান।

চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল পর্যায়ক্রমে রায়ের বিভিন্ন অংশ পাঠ করেন। মোট ২৪৩ পৃষ্ঠা রায়ের মধ্যে সারসংক্ষেপ ৭৫ পৃষ্ঠা পড়ে শোনান।

রায়ের আগে গোলাম আযমকে সকাল ১০টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেল থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা ও টুপি পরিহিত গোলাম আযমকে একটি হুইল চেয়ারে বসিয়ে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়।

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে হাইকোর্ট সংলগ্ন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চারপাশে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে পুলিশ-র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এছাড়া রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির সোমবার হরতালে ডেকে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে। সাতক্ষীরায় এক আওয়ামী লীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ওই দলের নেতাকর্মীরা এবং কুষ্টিয়ায় মারা গেছে আরও দুজন। চট্টগ্রামে শিবিরের হাত বোমায় পা হারিয়েছেন দুযুবক।

মুক্তিযুদ্ধের পর গোলাম আযম ১৯৭৮ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফেরেন।

১৯৯৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমিরের পদ থেকে অবসরে গেলেও দলটির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে তিনি সম্পৃক্ত।

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর গঠনে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে তার বিচারের দাবি ছিল দীর্ঘ দিনের।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে তার জামিনের আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। এরপর থেকে গোলাম আযম কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন।

এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান ও সাবেক সদস্য আবুল কালাম আজাদকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। - See more at: http://www.bengalinews24.com/law-and-court-human-rights/2013/07/15/10768#sthash.IRpzUrHj.dpuf

Post a Comment

0 Comments