১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক মান্নানের কাছে নিজ কেন্দ্রে ১১০ ভোটে পরাজয়ের পর গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৮৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেন ।
দিনভর বিএনপির অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ আর বিক্ষিপ্ত কিছু সহিংসতার মধ্য দিয়ে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে বেসরকারি ফলাফলে জয়লাভ করেন ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান । তিনি ১৪ দল সমর্থিত আজমত উল্লা খানকে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৮৮ ভোটের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন।
৩৯২ কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে বিএনপির মান্নান পেয়েছেন ৪ লাখ ৬৮ হাজার ভোট। আর আওয়ামী লীগের আজমত পেয়েছেন ৩ লাখ ১২ ভোট।
শনিবার সকাল ৮টায় একযোগে ৩৯২টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। চলে একটানা বিকেল ৪টা পর্যন্ত । বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট গ্রহণ শেষ হয়। এতে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ।
জিসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে ক্ষমতাসীন ১৪ দল সমর্থিত আজমত উল্লাহ খান ও বিরোধী ১৮ জোট সমর্থিত অধ্যাপক এম এ মান্নান ছাড়াও আরো ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। তবে এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। ফলে ব্যালট পেপারে নাম ও তার প্রতীক ছিল। জাহাঙ্গীরের প্রতীক আনারস।
এছাড়াও এ সিটি করপোরেশনের ১৯টি ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে ১২৬ জন ও ৫৭টি ওয়ার্ডের সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ৪৫৫ জন প্রার্থী বিভিন্ন প্রতীক নিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জিসিসি নির্বাচনে ৩৯২টি কেন্দ্র ও ২ হাজার ২৮৯ টি বুথ ছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে মোট ৩৯২ জন প্রিজাইডিং অফিসার ও প্রতিটি বুথে একজন করে মোট ২ হাজার ২৮৯ জন সহকারী প্রিজাইডিং এবং দুইজন করে মোট চার হাজার ৫৭৮ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করেন।
গত ১৬ জানুয়ারি ৩২৯ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠিত হয়। নবগঠিত এ সিটি করপোরেশনে ১৯টি সংরতি মহিলা ওয়ার্ড ও ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ড রয়েছে। এতে ভোটার রয়েছে ১০ লাখ ২৬ হাজার ৯৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৭৭৭ ও নারী ভোটার চার লাখ ৯৯ হাজার ১৬১।
দোয়াত-কলম উল্টানোর নেপথ্যে .....
দেশের সর্ববৃহৎ আয়তনের গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী মেয়র প্রার্থী এডভোকেট আজমত উল্লা খানের বড় ব্যবধানে হারের পেছনে রয়েছে মূলত পাঁচটি বড় কারণ। সর্বশক্তি নিয়োগ করেও গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেনি ক্ষমতাসীন দলটি। আগের ৪ সিটি করপোরেশনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের জয়ের ধারাবাহিকতা, হেফাজত ইস্যু, বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ইস্যু, জাতীয় পার্টির নাটকীয়তায় আওয়ামী লীগের এই দুর্গ হাতছাড়া হয়েছে। হারের পেছনে কাজ করেছে দলীয় কোন্দলও। গোপালগঞ্জের পর এই জেলাকে আওয়ামী লীগ তাদের দুর্গ হিসেবে দেখতো। গাজীপুর-১ ও গাজীপুর-২ সংসদীয় আসনের আংশিক এলাকা নিয়ে ৩২৯ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নবগঠিত এই সিটি করপোরেশন।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী এডভোকেট আজমত উল্লা খানের ক্লিন ইমেজ থাকলেও জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়েছে এই নির্বাচনে। শুরু থেকেই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীরকে ম্যানেজ করতে না পারায় অনেকটা বিপাকে পড়েন আজমত। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে জাহাঙ্গীর এক প্রকার বাধ্য হয়ে ভোটের মাঠ ছাড়লেও ছাইচাপা আগুনে ফুঁসেন তার কর্মী-সমর্থকরা। ভোটের রাজনীতিতে জাহাঙ্গীরের দৃশ্যপট বদল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এম এ মান্নানকে অনেকটাই চাঙ্গা করে দেয়।
এদিকে আজমত মেয়র প্রার্থী হলেও শুরু থেকেই গুঞ্জন ছিল স্থানীয় এমপিদের অনেকেই তার পক্ষে নেই। তারা মুখে মুখে আজমতের দোয়াত-কলমের কথা বললেও অন্তরে অন্য কথা বলেন। আর ভোটের ৭২ ঘণ্টা আগে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংবাদ সম্মেলন করে আজমতকে সমর্থন জানালেও গাজীপুরের নেতাকর্মীরা ছিলেন মান্নানের পক্ষে। জাতীয় পার্টির অধিকাংশ ভোট পড়েছে টেলিভিশনে। জামাতের লোকজন শতভাগ ভোট দিয়েছেন মান্নানকে। প্রায় ৩শ কওমি মাদ্রাসায় প্রায় লক্ষাধিক ভোট রয়েছে হেফাজতেরÑ এর পুরোটাই গেছে মান্নানের পক্ষে। এছাড়া এমনিতে স্থানীয় বিএনপিতে মতবিরোধ থাকলেও এই ভোটকে সামনে রেখে তারা সবাই সব বিভেদ ভুলে মান্নানের জন্য মাঠে নামেন।
অন্য একটি সূত্র মতে, এই নির্বাচনে আঞ্চলিকতার ইজম ব্যাপক কাজ করেছে। মান্নানের বাড়ি গাজীপুর জেলায়। আর আজমতের বাড়ি টঙ্গী এলাকায়। ১০ লাখ ভোটারের মধ্যে ৩ লক্ষাধিক টঙ্গী এবং ৭ লক্ষাধিক গাজীপুরের বাসিন্দা। আজমত ১৮ বছর টঙ্গীর মেয়র থাকলেও সেখানকার অনেক এলাকা উন্নয়ন বঞ্চিত। ভোটে এর প্রভাব পড়েছে। ফলে টঙ্গিতেও আজমতের ফলাফল সুখকর নয়।
সূত্র আরো জানায়, নানা কৌশল করেও তরুণ ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভোট টানতে পারেননি আজমত। মূলত জিএসপি বাতিলকে সামনে এনে শ্রমিকদের ভোট টানার চেষ্টাও কাজে আসেনি। কারণ অল্প ও স্বশিক্ষিত শ্রমিকরা জিএসপি কী তা বুঝেনই না। আর তরুণরা সাড়া দিয়েছেন পরিবর্তনের ডাকে। নারী ভোটারদের একটি বড় অংশও সায় দিয়েছেন এতে। গাজীপুর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলেছেন,কেন্দ্র থেকে ৫৭ জন এমপির নেতৃত্বে ৫৭ ওয়ার্ডে টিম করে দেয়া হলেও ওই ৫৭ এমপির অনেকেরই রয়েছে ইমেজ সংকট। ভোটাররা তাদের ডাকে সাড়া না দিয়ে বিরক্ত হয়েছেন। এক্ষেত্রে বিএনপি দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সমস্যা, পদ্মা সেতু, হলমার্ক, ডেসটিনি, ইউনিপে টু কেলেঙ্কারি এবং ‘মতিঝিলে আলেমদের ওপর হামলা’ ও চার সিটিতে জয়ের প্রসঙ্গ সামনে এনে প্রচারণা চালিয়ে ভোটারদের মন জয়ে কাজ করে। নানা সমীকরণে ভোটাররা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আজমতকে লালকার্ড দেখিয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপির একাধিক কর্মী বলেছেন, এই নির্বাচনে আজমতের ভোট ব্যাংক বলে কিছু ছিল না। এমনকি তার দলীয় ভোটেও ভাগ বসিয়েছেন মান্নান। আর কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে স্থানীয় নেতাকর্মীরা দোয়াত-কলমের পক্ষে ভোট চাইলেও আন্তরিকভাবে তারা মানুষের দুয়ারে না যাওয়ায় ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তার কাছ থেকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় ভোটব্যাংকেও কড়া নেড়েছে বিএনপি।
অপর একটি সূত্র মতে, মর্যাদার এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আওয়ামী লীগ উত্তরায় ব্লাকরোজ হোটেলে অফিস নিয়ে বসলেও সেখানকার কৌশল কাজে আসেনি। মূলত সেখানে যারা মাঠের চিত্র পর্যালোচনা করেছেন তারা ভোটের মেজাজ বুঝতে পারেননি। আর যারা মেজাজ বুঝেছেন তারা সিনিয়র নেতাদের ‘ধমক’ খাওয়ার ভয়ে পজিটিভ সব কথা বলেছেন। এছাড়া সেখানে যারা কিং মেকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অনেকের নিজ এলাকাতেই অবস্থান নড়বড়ে। সব মিলিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করলেও গোড়ায় গলদ থাকায় গাজীপুরে আওয়ামী লীগের দুর্গ দখল করে নিয়েছে বিএনপি।


0 Comments