এম আমান উল্লাহ
আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে কক্সবাজারকে ব্যবহার করছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। ফলে কক্সবাজার জেলায় উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে মাদক ব্যবসায়ী এবং সেবনকারীর সংখ্যা। এক পরিসংখ্যান মতে, কক্সবাজারে গত বছরের তুলনায় এ বছর মাদক ব্যবসায়ী প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর
মাদক সেবনকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১০ শতাংশ।
মাদক সেবনকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১০ শতাংশ।
এদিকে, ২৬ জুন পালিত হচ্ছে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার ও পর্যটন এলাকা হিসেবে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে জেলার সাধারণ মানুষ মাদক নিয়ে শঙ্কিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী কক্সবাজার জেলায় এক বছরে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিনগুণ। এর বেশিভাগই ইয়াবা ব্যবসায়ী ও পাচারকারী।
২০১০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন দফতরে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমার সীমান্ত থেকে চোরাইপথে আনা ইয়াবা টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হয়ে সারা দেশে পৌঁছে যাচ্ছে নীরবে। আর শুধু বাংলাদেশের চাহিদার কথা বিবেচনা করে মিয়ানমারে স্থাপিত হয়েছে সাতটি ইয়াবা কারখানা। প্রতিদিন গড়ে দুই লাখেরও বেশি ইয়াবা তৈরি হচ্ছে এসব কারখানায়। টেকনাফের ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে সংঘবদ্ধ ২০টি সিন্ডিকেট বাংলাদেশে ইয়াবা আনছে। আর সিন্ডিকেট প্রধানরা নানা কৌশল অবলম্বন করে দেশব্যাপী এসব ইয়াবা পাচার করছে।
২০১২ সাল পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইয়াবা ব্যবসায়ী প্রায় সাড়ে তিনশ’ জনের নাম তালিকাভূক্ত করেছিল। কিন্তু এক বছরে তা বেড়ে এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। চিহ্নিত করা যায়নি এমন আরো অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন। এমনকি টেকনাফের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে গেছে বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিবেদেন উল্লেখ রয়েছে। ইয়াবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অন্যান্য মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুণ।
মাদকাসক্তদের নিয়ে কর্মপরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা ‘নোঙরে’র পরিচালক দিদারুল আলম রাশেদ জানিয়েছেন, ২০১২ সালের শুরুতে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে জরিপে ৮০ হাজার মাদকাসক্তকে শনাক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে নতুন কোনো জরিপ পরিচালনা না হলেও এক বছরে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি বেড়েছে বলে অভিমত তার।
তিনি জানান, কক্সবাজারের মাদকের সহজলভ্য হওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারে প্রায় ৩২ ধরনের মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে বেশিভাগ পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে আসে।
প্রায় প্রতিদিনই কক্সবাজারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য জব্দ করে আসছে। এসময় পাচারকারীদের আটক করতে সক্ষম হলেও গডফাদাররা রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ফলে পাচারকারীরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো মাদক পাচারে জড়িয়ে যাচ্ছে। গত ছয় মাসে কক্সবাজারে প্রায় আড়াই কোটি টাকার মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে বিজিবির টেকনাফ-৪২ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা এক কোটি টাকার বেশি মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে।
বিজিবির টেকনাফ-৪২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জাহিদ হাসান জানিয়েছেন, জানুয়ারি থেকে ২২ জুন পর্যন্ত ২৬ হাজারেরও বেশি পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১২ কেজি গাঁজা, ১৫ শ’ বোতল বিয়ার ও মদ, চারশ’ দুই লিটার চোলাই মদ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ২৬ জন ছাড়াও চারশ’ ৬৬টি মামলা দায়ের করেছে বিজিবি।
কক্সবাজার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-৭ এর সদস্যরা গত তিনমাসে প্রায় ৩৩ হাজার ইয়াবা সহ ২৩ জনকে আটক করেছে বলে জানিয়েছেন, কক্সবাজার ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর সরওয়ার-ই আলম। তিনি জানান, এ সময়ে মামলা হয়েছে ১৮টি।
কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তিনটি কার্যালয়ে অভিযানে প্রায় ২৫ হাজার ইয়াবা, ৭৮ বোতল রিয়ার ও মদ, আট কেজি গাঁজা, একশ’ দুই লিটার চোলাই মদ, পাঁচ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৬৮ জনকে আটক করে ৬৮টি মামলা করেছে বলে জানিয়েছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার অফিসের পরিদর্শক অমর কুমার সেন।
জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুর আলম জানিয়েছেন, গত তিন মাসে জেলা বিভিন্ন স্থান থেকে ২৮ হাজারের বেশি ইয়াবা, একশ’ ৭০ বোতল ফেনসিডিল, ২৩ বোতল মদ, ২০ কেজি গাঁজা, দুই হাজার লিটার চোলাই মদসহ দেড় শতাধিক আসামিকে আটক করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মামলা হয়েছে ৬০টি। এ ছয়মাসে বিজিবির কক্সবাজারস্থ ১৭ ব্যাটালিয়ন ও জেলা পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে জব্দ করেছে আরো বিপুল ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য। কিন্তু এরপরও থামছে না মাদক ব্যবসা এবং সেবনকারীর সংখ্যা। এর কারণে উদ্বেগ হয়ে উঠেছে জেলা সাধারণ মানুষ।
‘নোঙরে’র পরিচালক দিদারুল আলম রাশেদ আরো জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সেবনকারীর সংখ্যাও বাড়ছে। এ সেবককারীর তালিকায় যোগ হয়েছে শিশু, কিশোরসহ বিভিন্ন তরুণরা। যা সাধারণ উদ্বেগজনক। এ ব্যাপারে সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা সৃষ্টি করা না হলে এ সমস্যা মহামারিতে রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে ২৬ জুন পালিত হচ্ছে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং অবৈধ পাচারবিরোধী আর্ন্তজাতিক দিবস।

0 Comments