Advertisement

পবিত্র শবেবরাতে করণীয় ও বর্জনীয়

এ এইচ মোস্তফা কামাল :
শবেবরাত বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ধর্মীয় পর্ব। ১৪ শাবান দিবাগত রাতে শবেবরাত উদযাপিত হয়। দেশের সব অঞ্চলের সব বয়সের মানুষ এতে অংশ নেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রন্থে এ মর্মে উল্লেখ আছে যে, ‘ইরান ও ভারত উপমহাদেশে এই মাসের একটি রজনীকে শবেবরাত বলা হয়। আচেনীয়রা একে বলে ‘কান্দুরি বু’। জাভার অধিবাসীরা একে ‘রুয়াহ’ বলে আখ্যায়িত করে। আর তিগ্রে গোত্র একে ‘মাদ্দাগেন’ বলে। মাদ্দাগেন শব্দের অর্থ যা রজব মাসে অনুগমন করে। মরক্কোতে শাবান মাসের সমাপ্তি দিবসে একটি উৎসব পালিত হয় বলে ইসলামী বিশ্বকোষ থেকে জানা যায়।
ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে শাবান মাসের ১৫ তারিখ রাতে মরহুম ব্যক্তিদের রূহের মাগফিরাত কামনার উদ্দেশে দোয়ার অনুষ্ঠান হয়। এ সময় বিশেষ যতœসহকারে কবরস্থানগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। এ উপলক্ষে সেখানে খাদ্য বিতরণ করা হয়, যা ‘কান্দুরি’ নামে খ্যাত। দোয়ার অনুষ্ঠানের সুবাদে মরহুম ব্যক্তিদের রূহের মাগফিরাত কামনা করা হয় বলে সেখানকার অধিবাসীরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন। সেখানে ওই রাতে বিশেষ নামাজও আদায় করা হয়। সেখানে একে সালাতুল হাজা বলা হয়। শাবান মাসের শেষের কয়েক দিনে সেখানে মেলাও বসে। (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ)।
শবেবরাতকে ‘লাইলাতুল বারায়াত’ নামে অভিহিত করা হয়। ‘লাইলাতুল’ আরবি শব্দ এবং ‘শব’ ফারসি শব্দ। উভয় শব্দের অর্থ হলো রাত। অপরপক্ষে ‘বারায়াত’ শব্দের অর্থ নাজাত, নিষ্কৃতি বা মুক্তি। এই রাতে আল্লাহর বান্দারা মহান আল্লাহ পাকের ক্ষমা লাভ করে বলে এ রাতকে লাইলাতুল বারআত বা শবেবরাত বলা হয়। হাদিস শরিফে ১৪ শাবানের রাত ‘লাইলাতুল নিসফে মিন শাবান’ অর্থাৎ অর্ধশাবানের রাত হিসেবে বিবেচিত। আরববাসীর কাছে এটি শাবানের মধ্যরাত হিসেবে পরিচিত। তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানে এই রাত শবেবরাত হিসেবে খ্যাত।
হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা: থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের ১৪ তারিখে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন’ (তাবরানি)। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘এটি মধ্য শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ পাক অগণিত মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির সৌভাগ্য দান করেন। এমনকি কালব গোত্রের ভেড়ার পালের পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি।’ শবেবরাত সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া বলেন, ‘শাবানের মধ্য রজনী সম্পর্কে এটি বলা যায়, এর গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক হাদিসের বর্ণনা রয়েছে এবং অনেক জায়গায়ই এটি গ্রন্থিত ও বিবৃত হয়েছে যে, পূর্ববর্তী আলেমসমাজ এ রাতে একাকী নামাজে মগ্ন থাকতেন।’
শবেবরাতে করণীয় : পবিত্র এই রাতটি নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, তাসবিহ পাঠ ও দোয়ার মাধ্যমে অতিবাহিত করা যায়।
নামাজ : রাত জেগে নামাজ পড়া গুরু ত্বপূর্ণ ইবাদত। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে : ‘সিজদা করো এবং আমার নিকটবর্তী হও’। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়, আত্মিক প্রশান্তি অর্জিত হয় এবং নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে।
আল্লাহর রাসূল সা: কত মনোযোগ ও একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়তেন তা হজরত আয়েশা রা:-এর একটি বর্ণনা থেকে জানা যায়। তিনি বলেন, ‘এক রাতে রাসূল সা: তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করছিলেন। এত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি সিজদারত ছিলেন যে, আমি ভয়ে কাতর হয়ে ভাবলাম, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। যখন আমি এ রকম দেখলাম তখন (বিছানা থেকে) উঠলাম এবং তিনি বেঁচে আছেন কি না তা নিশ্চিত হতে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নেড়ে দেখলাম। বৃদ্ধাঙ্গুলিটি নড়ে উঠল। ফলে আমি স্বস্থানে ফিরে এলাম। এ সময় আমি শুনলাম রাসূল সা: সিজদারত অবস্থায় দোয়া করছেন।’
শবেবরাতে বর্জনীয় : এই রাতে যেসব বর্জনীয় কাজ পরিলক্ষিত হয় তার মধ্যে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো, কবরে মোমবাতি জ্বালানো, হালুয়া-রুটি তৈরি ও বিতরণ অন্যতম। আতশবাজি ও পটকা ফোটানো : শবেবরাতের রাতে এটি অন্যতম গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। এতে ইবাদত-বান্দগির পূতপবিত্র পরিবেশ বিঘিœত হয়। আর্থিক দিক থেকে অপব্যয় ও অপচয়মূলকও বটে। হালুয়া-রুটি : খাদ্য তৈরি বা বিতরণ খারাপ কাজ নয়। কিন্তু একটা বিশেষ ভ্রান্ত প্রেক্ষাপট স্মরণে রেখে হালুয়া-রুটি তৈরি ও বিতরণ জরুরি মনে করা বিদআত রূপে পরিগণিত হয়। বিদআত সর্বদাই পরিত্যাজ্য।
সমাজজীবনে শবেবরাতের প্রভাব : বাংলাদেশে সর্বত্র শবেবরাত পালিত হয়। আমাদের সমাজজীবনে এর অপরিসীম প্রভাব লক্ষ করা যায়। ইতিবাচক প্রভাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ১৫ শাবান রাতে নামাজ পড়ার প্রতি অনেক বেশি আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় অন্য সময়ের তুলনায় বেশি মাত্রায়। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া, কুরআন শরিফ তিলাওয়াত, দোয়া ও মুনাজাত করার আগ্রহ দেখা যায় অনেক বেশি। গরিব-মিসকিনদের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য বিশেষ করে রুটি, টাকাপয়সা দান করতে দেখা যায়। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়াা-প্রতিবেশীদের মধ্যে শবেবরাত উপলক্ষে বেশি হারে আসা-যাওয়া ও খানাপিনা করতে দেখা যায়। ভ্রাতৃত্ববোধের নতুন উজ্জীবন লক্ষ করা যায় এ সময়। অভাবিত এক ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি হয় দেশজুড়ে।
শবেবরাতে র্ধ্র্মীয় দিক থেকে মানুষ অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। মানসিক দিক থেকে মানব মন কোমল হয়ে পড়ে। ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয় সবার মধ্যে। দান-খয়রাত করার প্রতি আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। মনে বিনয়ভাব সৃষ্টি হয়। আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার এক বিরল অবস্থা তৈরি হয়। মোটকথা একটা অভূতপূর্ব ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি হয়। এ অবস্থায় আমাদের করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি দরকার। ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি ও কল্যাণ সমাজ বিনির্মাণে মানব মনের এই আবেগ, উচ্ছ্বাস ও ভাবকে কাজে লাগাতে হবে। শবেবরাতের রাতের মতো কমপক্ষে জুমাবারের রাতগুলো ইবাদত-বন্দেগি ও নিরাপত্তার দিক থেকে পুণ্যময় রজনী হয়ে উঠুক। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপটে এটাই প্রত্যাশা।

Post a Comment

0 Comments