Advertisement

জেলায় বৃষ্টি-পূর্নিমার জোয়ারে প্লাবিত : ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি


এম.জসিম উদ্দিন ছিদ্দিকী কক্সবাজার
জেলায় ভারি বর্ষণ ও পূর্নিমার জোয়ারের প্রভাবে শতাধিক গ্রাম পানিতে প¬াবিত হয়েছে। এতে কাঁচা বাড়ি-ঘর, ফসলী জমি, লবণের মাঠ, চিংড়ি ঘের সহ ইত্যাদির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। জেলার সদর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, রামু ও টেকনাফের অবস্থা ভয়াবহ। এসব এলাকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন দুর্গতরা। বিশেষ করে সদরের সমিতি পাড়া, নাজিরারটেক, ফদনার ডেইল, পেশকার পাড়া, খুরুস্কুল, বাংলাবাজার,
খুরুলিয়া, চৌফলদন্ডী, পোকখালী, মহেশখালীর ধলঘাট ও মাতারবাড়ীসহ ২০টি গ্রাম জোয়ারের পানিতে প¬াবিত হয়েছে। শত শত লোক  পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি প্রবেশ অব্যাহত থাকায়  জনদূভোর্গ আরো চরম আকার ধারণ করেছে। ব্যাপক বৃষ্টিপাত ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে মহেশখালী ধলঘাটা, মাতারবাড়ীর চিংড়ী ঘের ও অরক্ষিত বেড়ীবাঁধের বিশাল এলাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও গোরকঘাটা জনতাবাজার সড়কসহ প্রধান সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গনের কারণে সড়ক পথে গাড়ী চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে।  বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করায় গত কয়েক দিন মহেশখালীর শত শত জেলে কর্মহীন সময় কাটাচ্ছে। জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় শত শত বাড়ী ঘরে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরের কুতুবদিয়া পাড়া, সমিতি পাড়া, নাজিরারটেক, এসএমপাড়া, বাজারঘাটা, পেশকারপাড়াসহ ১০টি গ্রামে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে জোয়ার ভাটায় দিন পার করছে প¬াবিত এলাকার মানুষ। বাকঁখালী খালের ভাঙ্গনে ফসলী জমি ও
ঝাউবাগান নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ফসলী জমি প¬াবিত হওয়ার ফলে আমন চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। সরকারী কোন উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। প্রবল বর্ষণ ও পূর্ণিমার জোয়ারের পানিতে রাস্তা ভেঙ্গে এ ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। অনেক স্থানে রাস্তা ভেঙ্গে পুরোটাই নদীতে পরিণত হয়েছে। এরপর থেকে প্রতিনিয়ত জোয়ার-ভাটা হচ্ছে ওই এলাকায়। এদিকে পেকুয়া উপজেলার ৩ ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উপচে ও ভেঙ্গে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। গত কয়েকদিন ধরে পুর্ণিমার প্রভাবে সামুদ্রিক জোয়ারে গতি বেড়েছে। এ কারনে উপকুলীয় ওই তিন ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্থ বেড়িবাঁধের ১৫ পয়েন্ট দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে এখন রীতিমত জোয়ার-ভাটা চলছে। এই অবস্থায় এসব জনপদের লোকজনের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত শুক্রবার দিনব্যাপী পূর্ণিমার জোয়ারে এসব এলাকার বেড়িবাঁধ উপচে জোয়ারে পানিতে সয়লাভ হয়ে যায় বেশিরভাগ নীচু এলাকা। উপজেলার রাজাখালী ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাবুল, উজানটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এটিএম শহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও মগনামা ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল মোস্তফা বলেন, পূর্ণিমার প্রভাবে জোয়ারের সময় সমুদ্রে পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থার কারনে উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের কাকপাড়া, শরৎ ঘোনা, রাজাখালী ইউনিয়নের সুন্দরী পাড়া, আমিনবাজার ও উজানটিয়া ইউনিয়নের করিয়ারদিয়া এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ উপচে ও ভেঙ্গে গিয়ে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। তারা বলেন, বেড়িবাঁেধর অন্তত ১৫ ভাঙ্গা অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার কারনে বর্তমানে কিছু কিছু এলাকায় রীতিমত জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় সামুদ্রিক পানি উঠে গেছে বসতবাড়িতে। পানিতে ভেসে গেছে অনেক চিংড়ি প্রকল্প। এলাকাবাসি জানায়, এসব এলাকার বেড়িবাঁধ গুলো আগে থেকে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এসব মাটি ক্ষয় হয়ে বেড়িবাঁেধর প্রায় এলাকা নিচু হয়ে গেছে। কয়েকদিন ধরে পুর্ণিমার প্রভাবে বেড়িবাঁধের কমপক্ষে ১৫ পয়েন্টে নতুন করে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ফাটল হওয়া পয়েন্ট দিয়ে বেড়িবাঁধ উপড়ে লোকালয়ে সহজে ঢুকে পড়ছে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি। পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো.ফয়জুর রব বলেন, পেকুয়ার প্রায় ১৫কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। কয়েকদিন ধরে ওই এলাকার বেড়িবাঁেধর ১৫ পয়েন্টের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে এখন সামুদ্রিক জোয়ারের পানি উঠানামা করছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ইতোপুর্বে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধের ভাঙ্গা অংশ মেরামতের জন্য ২ কোটি টাকার চাহিদা পত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও বরাদ্দ মেলেনি। তিনি বলেন, বরাদ্দ না পাওয়ায় এসব বেড়িবাঁধ সংস্কার করা যাচ্ছে না। এদিকে, ঈদগাঁও থেকে মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন জানান, সদর উপজেলার বৃহত্তর ঈদগাঁওতে মুষলধারে অবিরাম বৃষ্টি ও ঈদগাঁও নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সহস্রাধিক বাড়ীঘর পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ ছাড়াও আমন ধানের বীজতলা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলে অনেক এলাকা গলাসমান পানিতে ডুবে গেছে। ব্যস্ততম বাণিজ্য কেন্দ্র ঈদগাও বাজারে জমেছে হাটু পরিমাণ পানি। ঈদগাহ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও ঈদগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানি বন্দী। সরেজমিনে দেখা যায়, সদরের ঈদগাঁও, জালালাবাদ, ইসলামাবাদ, পোকখালী, ইসলামপুর, ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডীর নিম্নাঞ্চল সমূহ প¬াবিত হয়ে জলাশয়ের মতো দেখাচ্ছে পুরো এলাকা। উপকূলীয় ইউনিয়ন গুলোতে গতকয়েক দিনের প্রবল জোয়ারে বেড়ীবাঁধ বিধস্থ হওয়ায় লোনা পানি ঢুকেছে লোকালয়ে। পানি নিষ্কাশনের জন্য ওয়াপদার ¯¬ুইচগেটের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষন না থাকায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি নামতে না পারায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পানিবন্দী লোকজন অন্যত্র সরে গিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। আবদ্ধ দূষিত পানির কারণে অনেকেই  রোগাক্রান্ত হচ্ছে। টানা বৃষ্টির কারণে খেটে-খাওয়া মানুষের দূর্ভোগ বেড়েছে। কাজে যেতে না পারায় দিন মজুর শ্রেণীর লোকজন চরম অভাবের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। শুক্রবার ঈদগাঁও বাজারে জনসমাগম অন্যদিনের তুলনায় কম দেখা গেছে। অন্যদিকে রাতভর টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় বসতবাড়িতে চুরির খবর পাওয়া গেছে। বৃষ্টি ও রাতের আধারকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন পেশাদার অপরাধী ও চোর ডাকাত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বৃহত্তর ঈদগাঁও এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন ও আইন শৃংঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করে পানিবন্দী জনগণের জান-মালের সার্বিক নিরাপত্তাবিধান করার জন্য প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ঈদগাঁও’র সর্বস্তরের জনগণ। উখিযার কোটবাজার থেকে  পিপলু চন্দ্র দে জানান, উখিয়ায় কয়েকদিন ধরে প্রবল বষর্ণের ফলে উখিয়া উপজেলার প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অতি বর্ষনের কারণে পাহাড়ি ঢল সমুদ্রের জোয়ারের স্্েরাতে নাফ নদী, বাকঁখালী, রেজু খাল, মনখালী বড় খাল সহ বিভিন্ন খাল ও ছরার পানি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দু’উপজেলার কিছু কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চল পানির ¯্রােতে প্লাবিত হয়। সরজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, উখিয়া উপজেলার উপকূলীয় জালিয়াপালং ইউনিয়নের প্যাইনাশিয়া, লম্বরী পাড়া, জালিয়াপালং, সোনাইছড়ি, চেপঠখালী, মনখালী, রূপপতি, সোনারপাড়া, ঝুম্মাপাড়া, রতœাপালং ইউনিয়নের ক্লাসাপাড়া, তেলীপাড়া, পূর্বরতœা, পশ্চিম রতœা, মধ্যরতœা, সাদৃকাটা, ভালুকিয়াপালং, হলদিয়াপালং ইউনিয়নের রুমখাঁ চৌধুরী পাড়া, কুলালপাড়া, মহাজন পাড়া, নাপিত পাড়া, পালংখালী ইউনিয়নের আনজুমানপাড়া, রহমতের বিল, ফারিরবিল, তেলখোলা, বালুখালী, থ্যাইনংখালী, গজুঘোনা, দামনখালী, রাজাপালং ইউনিয়নের ঘিলাতলী পাড়া, দরগাহবিল, কুতুপালং, মাছকারিয়া, শিলেরছড়া, রাজাপালং, কাশিয়ারবিল, খালকাঁচা পাড়া, হরিণমারা, হিজলিয়া সহ প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। এসব গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি তলিয়ে যায় এবং এখনো মানুষ পানি বন্দী অবস্থায় রয়েছে। রাজাপালং ইউনিয়নের প্লাবিত গ্রাম খালখাচা পাড়ায়, জালিয়াপালংয়ের প্যাইনাশিয়া ও রতœাপালংয়ের সাদৃকাটা দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরবাড়িতে পানি থৈ থৈ করছে। তাছাড়া ৫টি ইউয়িনের এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম সহ মৎস্য খামার ও পুকুর প্রবল বর্ষনে প্লাবিত হয়। এসব এলাকার কয়েকটি মুরগির খামার পানিতে তলিয়ে যায়। টানা বর্ষনে পানির প্রবল ¯্রােতের কারণে এলাকার কাচাঁ ও ইটের তৈরী সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং অনেক ব্রীজ, কালভার্ট ঝুঁকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। এদিকে চিংড়ী চাষ সমৃদ্ধ ইউনিয়ন পালংখালীতে থাইংখালী ও বালুখালী, ধামন খালী ও মুছারখোলা এলাকায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারনে প্রায় কয়েকশ একর চিংড়ীর খামার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাছাড়া পাহাড়ের ঢালুতে অবস্থিত প্রায় ৫ শতাধিক কাচা ঘরবাড়ী ঝুঁকির সম্মূখিন হয়ে পড়েছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো সাইফুল ইসলাম জানান, প্লাবিত প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে খোজ নেয়া হচ্ছে। ভারী বর্ষণে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থদের তাই উপজেলার ক্ষতিগ্রস্থদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসার আহবান জানান সচেতন মহল।

Post a Comment

0 Comments