Advertisement

পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর নির্দেশ

নিজস্ব অর্থায়নে খুব শিগগিরই পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন।
একইসঙ্গে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টাও অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দেন তিনি। তবে বিশ্বব্যাংককে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অনুরোধ জানানো হবে না।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, পদ্মাসেতুর প্রাথমিক নির্মাণকাজ শুরু করতে সাড়ে ২৭ কোটি (২৭৫ মিলিয়ন) ৫০ লাখ ডলারের প্রয়োজন। বর্তমানে আমাদের রিজার্ভ রয়েছে ১৩০০ কোটি ডলারের মতো। সেখান থেকে ১০০ কোটি ডলার সরকার ইচ্ছে করলে নিতে পারে। এছাড়া নিজস্ব অন্যান্য অর্থায়নের উৎসের মধ্যে রয়েছেÑ সরকারের নিজস্ব তহবিল, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প থেকে অর্থ সংগ্রহ, বন্ড ইস্যু, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ, প্রবাসীদের রেমিটেন্স থেকে অর্থ সংগ্রহ প্রভৃতি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরো জানান, পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দাতা সংস্থা এডিবি, জাইকা ও আইডিবির সঙ্গেও আলোচনা অব্যাহত রাখবে সরকার। তবে বিশ্বব্যাংককে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আর কোনো অনুরোধ জানানো হবে না। সরকার মনে করেÑ পদ্মাসেতু বিষয়ে আমাদের ভূমিকা সঠিক ছিল। তবে বিশ্বব্যাংক যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেই এগিয়ে আসে তাহলে তাকে স্বাগত জানানো হবে। দেশের কাক্সিক্ষত এ সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়ন বাতিল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিলো। উল্লেখ্য, মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে গতকাল রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি সেতু নির্মাণের সময়সীমা, অর্থায়নসহ সার্বিক রূপরেখা সংসদে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরেই নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মধ্যেই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে। আমরা পর্যায়ক্রমে সেতুর নির্মাণকাজ চালিয়ে যাবো। একইসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক আমাদের এই সেতু নির্মাণকাজে দেরি করিয়ে দিয়ে যে ক্ষতি করেছে তার জন্য ক্ষতিপূরণ চাওয়া হবে। আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কারো কাছে মাথানত করিনি; করবোও না।
বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যখন দেশের উন্নয়নের কাজ করতে চাই তখনই তারা বাধা দেয়। এই দেশটাকে আমরা উন্নত করতে চাই। আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। আমাদের কেউ দান-খয়রাত করেনি। আমরা ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এদেশ অর্জন করেছি।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা দেশের এবং জনগণের উন্নয়নের কাজ শুরু করেছিলেন। ’৭৫ সালে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এর পরের ঘটনা সবার জানা। আমরা যখন ক্ষমতায় আসি আমাদের একটা চিন্তা মাথায় থাকে তাহলোÑ কিভাবে আমরা দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করবো। প্রতিমুহূর্ত আমরা এই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করি। বিশ্বব্যাংক সামান্য অজুহাতে বাংলাদেশের ক্ষতি করেছে অভিযোগ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের উন্নয়নকে পিছিয়ে দেয়া কোনো বাঙালি মেনে নিতে পারবে না। সেজন্য আমরা দাতাদের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের চিন্তা-ভাবনা করছি। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ১৫০০ কোটি টাকা খরচ করেছি। মূল সেতু নির্মাণে ১৫ হাজার কোটি টাকা, নদীশাসনে ৭২০০ কোটি টাকাসহ ২২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা খরচ হবে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক আমাদের দেরি করিয়ে দেয়ার জন্য খরচ বেড়ে গেছে। দেরি করানোর জন্য তাদের কাছে জরিমানা চাওয়া উচিত।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছি। সেখানে ৫৫ হাজার কোটি টাকা উন্নয়ন বাজেট। সেখান থেকে অনেক টাকা শর্টকাট করতে পারি। ওই শর্টকাটের টাকা দিয়ে আমরা পদ্মা সেতুর অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারি। যেহেতু একসঙ্গে টাকা লাগছে না সেহেতু আমরা নিজস্ব অর্থায়ন দিয়েই পদ্মা সেতু করতে পারি। অনুন্নয়ন বাজেট কমানো সম্ভব নয়। এ জন্য উন্নয়ন বাজেট থেকে আমরা ২৪ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারি। সেজন্য আমাদের কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের টাকা দিয়েই আমরা সেতুর কাজ শুরু করতে পারি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, অতি শিগগিরই আমরা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারবো। এর মধ্যে কোনো বিদেশী বিনিয়োগকারী আসতে চাইলে আমন্ত্রণ জানাবো; কিন্তু সময়ক্ষেপণ করবো না।
পদ্মা সেতুর বিকল্প অর্থায়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যে রেটিং দিয়েছে তাতে যে কোনো ধরনের বন্ড আমরা বাজারে ছাড়তে পারি এবং এই বন্ড দিয়ে আমরা অনেক টাকা উপার্জন করতে পারি। ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করবো। তাতে আমাদের বহু টাকা উঠে আসবে। যমুনা সেতুর মতো আমদানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সারচার্জ প্রয়োগ করবো। দেশের অপ্রন্তরেও বন্ড ছাড়তে পারি। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা কাজ শুরু করলে ১২/১৩ বছরে কী পরিমাণ টাকা লাগবে তার হিসাব করেছি। দেশীয় বন্ড থেকেও অর্থ সংগ্রহ করবো। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ তহবিলে ৩ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। এ টাকাও খরচ করবো। এ বিষয়ে জনগণের সমর্থন আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমার দুটি টেলিফোন অনবরত বেজে যাচ্ছে। লাউড স্পিকার দিয়ে শুনছি। প্রবাসী বাঙালিরা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শ্রমিকরা পর্যন্ত আমাকে বলেছে, আপা আপনি পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করেন। যতো টাকা লাগে আমরা দেবো। এখন যে টাকা রেমিটেন্স পাঠাচ্ছি তার থেকে বেশি রেমিটেন্স পাঠাবো। ছাত্রছাত্রীরা তাদের টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে পদ্মা সেতুর জন্য দিতে চেয়েছে। সারা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আমি যে চেতনা দেখেছি তাতে আমি আশাবাদী। পদ্মা সেতু আমাদের অর্থায়নেই হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ, যারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে তারা কখনো মাথানত করেনি। মাথানত করতে পারে না। তিনি বলেন, সারাদিন ফোন বাজছে। সব ফোন ধরতে পারি না। সম্ভব না। তবে ফোনের মাধ্যমে মানুষের কথায় যে সাহস ও সমর্থন পেয়েছি তাতে আমি দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ। তাদের সমর্থন-সহযোগিতায় মনে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি যে চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছিল পদ্মা সেতুর জন্য আবার সেই চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু করতে হলে উন্নয়ন বাজেট থেকে কিছু কমাতে হবে। এরপরও আমরা উন্নয়ন করতে পারবো। কারণ পদ্মা সেতু নির্মিত হলে আমাদের অর্থনৈক প্রবৃদ্ধিতে একটা ভূমিকা রাখবে।

Post a Comment

0 Comments